নিজের উৎপাদিত কচুর লতি বাজারে বিক্রি করে প্রশংসিত ড. প্রিন্স

প্রকাশিত : মে ১৬, ২০২২ , ৪:৪৬ অপরাহ্ণ

মোঃ আজিজুর রহমান ভূঁঞা বাবুল, ময়মনসিংহ, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন:ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে হাতিলেইট গ্রামে শ্বশুরবাড়ি এলাকায় জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ শুরুর পর নিজের বাগানের উৎপাদিত কচুর লতি একই উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বাবুলের বাজারে বিক্রি করে ভাইরাল হয়ে প্রশংসায় ভাসছেন অধ্যাপক ড. আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স। গত দুই দিন ধরে তার ছবি ফেইসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘটনার দিন ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে বাবুলের বাজারে নিজের খামারে উৎপাদিত কচুর লতি বিক্রি করতে বসার পর সেই মুহূর্তের কয়েকটি ছবি তুলে রাখেন তার কর্মচারী আল আমীন। আর হৃদয় নামে আরেক কর্মচারীর আইডি থেকে করা একটি পোস্ট শেয়ার করে ‘কিষান কৃষি উদ্যোগ’ নামে একটি আইডিতে আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স লেখেন, ‘আজ স্থানীয় বাজারে ১৬ কেজি কচুর লতি বিক্রি করলাম। কেজি ৫০ টাকা, বাজারের সবচেয়ে দামি সবজি এখন। পাইকার বলেছিল ৪০ টাকা, দিইনি। তবে লতির সম্ভবত জাত-পাত আছে, আরেকটু মোটা আছে কিছু, সেগুলো একটু কম। যদিও তিনজনের কাছ থেকে বাজার দামের চেয়ে কম নিয়েছি, কারণ তাদের কাছে লতি কেনার তেমন টাকা ছিল না। লতিটা বিলের পাশের এলাকার একটা অভিজাত আইটেম, কারণ এখানে হরহামেশা গুঁড়া মাছ পাওয়া যায়। আইডিয়ায় নেওয়া। মনে হচ্ছিল ক্ষেতে এক মণ প্রডাকশন হলেও বিক্রি হতো। এই সময় ধান কাটা কামলাদের হাতে টাকা থাকে। সেখানে তিনি আরও লেখেন, ‘পোস্টটি দেখার পর ছবির পাশের পিচ্চিটার জন্য মায়া লাগছে, বেচারার বয়স সম্ভবত পাঁচ-ছয় বছর হবে। আমাদের পাঁচ-ছয় বছর বয়সের বাচ্চাদের সঙ্গে একটু কম্পেয়ার করি।’ এরপর থেকে বিষয়টি দেখে আশ্চর্য হয়ে তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিতে থাকেন অনেকে। এভাবে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যান অধ্যাপক ড. আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে হাতিলেইট গ্রামে শ্বশুরবাড়ি এলাকায় ৮ একর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করার প্রত্যয়ে গড়ে তোলেন ‘কিষান সমন্বিত কৃষি উদ্যোগ’ নামে একটি কৃষি খামার। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বছরে ৬ মাস ছুটি নিয়ে খামারে কৃষিকাজ করেন তিনি। ওই খামারে ড্রাগন ফলের তিন প্রজাতির পাঁচ হাজার গাছের বাগানে রয়েছে। রয়েছে মাহালিশা, কিউজাই, ব্রুনাই কিং, বাউ-৪, কাঁচামিঠা, তাইওয়া গ্রিন, কাটিমন, পালমার, মল্লিকাসহ ১০ প্রজাতির আম গাছ। এছাড়াও চায়না থ্রি, মঙ্গলবারিসহ তিন প্রজাতের লিচু, মিসরি শরিফা, স্ট্রবেরি, চেরি, থাই পেয়ারা, আম, লেবু, জাম্বুরা, মাল্টা, সফেদা, আতাফল, কদবেল, আমলকী, ডেউয়া, ডুমুর, কাঠবাদাম, জামরুল, থাই জাম্বুরা, লটকন ও কলা গাছ রয়েছে। দেশি-বিদেশি পাঁচ হাজার ফলগাছের একটি নার্সারি রয়েছে ওই বাগানে। বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় ড. প্রিন্সের বাড়ি। একজন সেনা কর্মকর্তা বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারসহ ঢাকায় আর্মি কলোনিতে বড় হয়েছেন। ২০০০ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এআইইউবি থেকে কৃষি ব্যবসায় ২০০৬ সালে এমবিএ ডিগ্রি নেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. হরিপদ ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে ডক্টরেট হন। নিজের ভাবনা বিষয়ে ড. প্রিন্স বলেন, আমাদের কৃষিজমির সংখ্যা কমছে। অথচ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। এ পরিস্থিতিতে আমাদের বেঁচে থাকতে হলে কৃষির সাথে পারিবারিক একটা সম্পর্ক থাকতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই বাগান করি। আর ছোটবেলা থেকে কৃষি নিয়ে এক নেশা কাজ করতো আমার মাঝে। প্রয়াত শ্বশুরের কাছ থেকেই কৃষির আদ্যোপান্ত হাতে-কলমে শিখেছি। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক হলেও কৃষিতে খুব পারদর্শী ছিলেন। তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিত একটি ফলের বাগান গড়তে সময় লাগে কমপক্ষে সাত থেকে আট বছর। ‘কিষান সমন্বিত কৃষি উদ্যোগ’ বাগানটির বয়স হয়েছে সাত বছরেরও বেশি। আমি নিজেকে এখনো সফল মনে করি না। কৃষির সফলতা আসবে তবে সেটি আস্তে আস্তে। উদ্যোক্তা দিনে দিনে অভিজ্ঞ হবে।
ড. প্রিন্স বলেন, নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফল আবাদ আমার লক্ষ্য। বাগানে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে নিজের উৎপাদিত কেঁচো সার ও জৈব সার ব্যবহার করি। ফলগাছে পোকামাকড় নিধনে বেশি ব্যবহার করি বিভিন্ন রকমের ফাঁদ।
উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কেউ যদি ভালো কৃষি উদ্যোক্তা হতে চায় এবং টিকে থাকতে চায় তাকে অবশ্যই সময় দিতে হবে, নিজের পণ্য নিজেকেই বিক্রি করতে হবে। অন্যের ওপর ভরসা করে সফল হওয়া যাবে না।
ভাইরাল ছবির ব্যাপারে ড. প্রিন্স বলেন, ঈদের পর থেকে অনেক শ্রমিক ছুটিতে আছেন। সেজন্য আমি নিজে স্থানীয় বাজারে ১৬ কেজি কচুর লতি নিয়ে যাই বিক্রি করতে। প্রথমে পাইকার ৪০ টাকা কেজি দরে কিনতে চেয়েছিল কিন্তু অন্যদের মতো সেখানে বসে থেকে ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেছি। ড. প্রিন্স আরও বলেন, আমি কৃষি ভালোবাসি। কৃষি নিয়ে স্বপ্ন দেখি। চাই সবাই কম-বেশি কৃষি কাজে সম্পৃক্ত হোক। কারণ বেঁচে থাকতে হলে সবাইকে কৃষি কাজ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বছরে ছয় মাস ছুটি নিয়ে খামারে কাজ করি। তিনি আরও বলেন, আমরা সবাই মানুষ। কে কোন পর্যায়ে আছি সেটা বড় বিষয় না। এছাড়া নিজের উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। এতে তরুণরা উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী হবেন।