এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য রেণু উৎপাদন ক্ষেত্র ঝিনাইদহের বলুহর হ্যাচারি

প্রকাশিত : আগস্ট ৩১, ২০২২ , ৯:০৭ অপরাহ্ণ

হেলালী ফেরদৌসী, ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন: বলুহর হ্যাচারি, এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য রেণু উৎপাদন ক্ষেত্র ঝিনাইদহের বলুহর হ্যাচারি। ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার বলুহর কেন্দ্রীয় মৎস্য হ্যাচারি বিদেশী মাছের রেণু উৎপাদনে সমৃদ্ধ ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে এক বিস্ময়কর সৃষ্টি । নামে-গুণে অনন্য ‘বলুহর হ্যাচারি’ স্মরণাতীত-কাল থেকে রুই, কাতলা, মৃগেলও কালিবাউশসহ অন্যান্য মাসের রেণু উৎপাদন করে আসছে। সবুজ শ্যামল সৌন্দর্যের চাবিকাঠির একমাত্র বাহক ও নিয়ন্ত্রক ‘বলুহর হ্যাচারি’।ঝিনাইদহের গর্ব ‘বলুহর হ্যাচারি’ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য রেণু উৎপাদন ক্ষেত্র ঝিনাইদহের বলুহর হ্যাচারি।কয়েক যুগ ধরে মাছের রেণু উৎপাদন করে ঝিনাইদহ জেলাসহ দেশের মৎস্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বলুহর হ্যাচারিকে কেন্দ্র করে সারা বছরে আবর্তিত হয় এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। উৎপাদিত রেণুর পরিমাণ এবং এখান থেকে উৎপাদিত মাছের হিসাব করলে দেখা যায়, এক বছরের চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে কোটচাঁদপুর বলুহর হ্যাচারি অবদান প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোসহ নানা সমস্যার মধ্যেও চলতি বছর থেকে উপজেলার বলুহর হ্যাচারিতে ভিয়েতনাম ও চীন থেকে উন্নত জাতের মাছের আমদানিকৃত রেণু নিয়ে মাছের রেণু উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রথম বছরেই মাঠ পর্যায়ের মাছ চাষিরা নতুন জাতের মাছের রেণু নিয়ে সাফল্য পাওয়ায় বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন প্রজাতির রেণুর কদর বেড়েছে । বর্তমান এই হ্যাচারিতে চীন থেকে আমদানিকৃত সিলবার, বিগ-হেড ও গ্রাস-কার্পের রেণু ও ভিয়েতনাম এর পাঙ্গাশ, কালি-বাউস এবং সুবর্ণ রুই মাছ লালন পালন করা হচ্ছে। যে কারণে ৩৮ বছর পর বলুহর হ্যাচারি পেয়েছে রেণু উৎপাদনে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার। হ্যাচারি কর্মকর্তারা আশা করছেন পুরানো ব্রুড মাছের সাথে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মাছ সংযোজন হলে বলুহর কেন্দ্রীয় হ্যাচারিতে রেণুর ব্রুড ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। হ্যাচারির কমপ্লেক্সের সংরক্ষিত তথ্য থেকে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলা গুলোতে মাছ চাষি, মৎস্যজীবী, হ্যাচারি, মৎস্য নার্সারি মালিক ও সাধারণ মানুষকে উন্নত জাতের কার্প জাতীয় মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করে আমিষের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে কোটচাঁদপুরের বলুহর গ্রামে দেশের সর্ববৃহৎ এবং এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য হ্যাচারি কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১০৩ একর আয়তন বিশিষ্ট এই হ্যাচারিতে রয়েছে ৩০টি দৃষ্টিনন্দন পুকুর। ঝিনাইদহ ছাড়াও এই হ্যাচারির উৎপাদিত রেণু যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, রাজবাড়ি, মেহেরপুর ও সাতক্ষিরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে যাচ্ছে। এলাকাবাসী ও হ্যাচারির কর্মচারীরা জানান, হ্যাচারি ম্যানেজার হিসেবে মোঃ আশরাফ-উল-ইসলাম যোগদানের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির পরিবর্তন ফিরে আসে। করোনা-কালীন সময়সহ অন্যান্য দুর্যোগের মধ্যেও হ্যাচারির শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৪৮ লাখ ১১ হাজার টাকা হলেও অর্জিত হয়েছে ৪৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। মহেশপুর উপজেলার হাসান আলী নামে এক মৎস্য চাষি জানান, ব্রুড উন্নয়নের পাশাপাশি ১৫ বছর বন্ধ থাকা প্রশাসনিক ভবন চালু করা হয়েছে হ্যাচারির ম্যানেজার মোঃ আশরাফ-উল-ইসলাম এর নেতৃত্বে । তিনি বলেন, ম্যানেজার মোঃ আশরাফ-উল-ইসলাম এর নেতৃতে হ্যাচারির মধ্যে আবর্জনা স্তূপে ভরা ছিল, সেগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা করে ফুল বাগান তৈরির মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন করেছেন হ্যাচারির ম্যানেজার। ক্যাম্পাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে মজবুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন ম্যানেজার আশরাফ । হাটগোপালপুর এলাকার চাষি তুষার আহম্মেদ জানান, আমার মতো দক্ষিণাঞ্চলের ১০ জেলার মৎস্য চাষিরা বলুহর হ্যাচারির রেণু নিয়ে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। অনেক বেকার যুবক পুনর্বাসিত হয়েছে। হ্যাচারিতে রয়েছে প্রশিক্ষিত জনবল অভাব। মোট ২৭টি পদের মধ্যে ১৯টি পদ শূন্য রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো জনবল নিয়োগ করা হলে এই হ্যাচারি রেণু উৎপাদনে আরও সফলতা পেতো। এছাড়া হ্যাচারির অতিপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন থেমে আছে। অনেক ভবন এখনো জরাজীর্ণ। প্রধান গেট থেকে বাঁওড় পর্যন্ত প্রাচীর ও রাস্তা সংস্কার জরুরী হলেও বছরের পর বছর পড়ে আছে। পোনা বহনের জন্য পিক-আপ ও মিনি ট্রাক্টর প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে না। হ্যাচারির রেণু উৎপাদন কাজের জন্য ৯ ইঞ্চি ডিপ সাবমারসিবল পাম্প ও বোরিং স্থাপন করা দরকার। হ্যাচারির কর্মচারীরা জানান, ১৫টি পুকুর পুনঃ-খনন ও রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ, পুকুর পাড়ের বৈদ্যুতিক লাইন সংস্কার, প্রশাসনিক ভবন আধুনিকরণ, স্টোর রুম মেরামত, রেণু উৎপাদনে ৫০ হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ওভার হেড ট্যাংক স্থাপন, ২৯টি পুকুরে ৪টি ৬ ইঞ্চি ডিপ সাবমারসিবল পাম্প ও বোরিং স্থাপন, একটি জেনারেটর স্থাপন, হ্যাচারি ভবন, স্টোর রুম, গার্ড সেড, স্টাফ কোয়াটার সংস্কার ও রেণু ক্রেতাদের বিশ্রামের জন্য সেড ও শৌচাগার নির্মাণ করা হলে বলুহর হ্যাচারি দেশে মাছ উৎপাদনে আরও সমৃদ্ধ ভূমিকা রাখতে পারতো। বলুহর হ্যাচারি ম্যানেজার মোঃ আশরাফ-উল-ইসলাম জানান, বলুহর কেন্দ্রীয় হ্যাচারি একটি সেবামুলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানসম্পন্ন রেণু উৎপাদন করে মৎস্য চাষিদের কাছে সুলভ মূল্যে বিক্রি করে থাকে। এছাড়া আধুনিক কলাকৌশল ও সর্বশেষ লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষিদের জীবন মান উন্নত করে থাকে। ফলে এলাকায় বেকারত্ব হ্রাসের পাশাপাশি ব্যাপক হারে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও বলেন দক্ষিণাঞ্চলের ১০ জেলার মাছ চাষি, মৎস্যজীবী, হ্যাচারি, নার্সারি মালিক ও সাধারণ মানুষের পুকুরে ৬০ ভাগ রেণু বলুহর কেন্দ্রীয় হ্যাচারি থেকে যায়। তিনি বলেন শুন্যপদে জনবল নিয়োগ ও হ্যাচারির মধ্যে অতিপ্রয়োজনীয় কিছু সংস্কার করা হলে বলুহর কেন্দ্রীয় হ্যাচারির মান আরও বৃদ্ধি হতো। এটা ঝিনাইদহ তথা দেশের একটি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান-মুখী প্রকল্প এটা নিয়েও একটি কুচক্রী মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করে হ্যাচারির উন্নয়ন ধারাকে অব্যাহত রাখার দাবি জানান এলাকাবাসী।