পদ্মায় সব হারিয়ে দিশেহারা চরের বাসিন্দারা : স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ , ৯:৪৮ অপরাহ্ণ

মোঃ আশরাফুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিনিধি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন: সীমান্ত-ঘেঁষা পদ্মা নদীর মাঝে ১৯৮৮ সালের দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের দশ রশিয়া থেকে সদরের উপজেলার নারায়নপুর ইউনিয়নের বত্রিশ রশিয়া পর্যন্ত জেগে উঠে বিস্তীর্ণ চর। এরপর সেখানে শুরু হয় বসতি স্থাপন। পদ্মা নদীতে বসতবাড়ি হারিয়ে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এই চরে আশ্রয় নেয় পদ্মাপারের বাসিন্দারা। গড়ে উঠে জনপদ। এরপর প্রায় ৩০ বছরে এখানকার জনসংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫০-৬০ হাজার। ধীরে ধীরে চরের বাসিন্দারাও রাষ্ট্রের দেয়া সকল সুযোগ সুবিধা পেতে থাকে। মূল ভূখন্ড থেকে অনেক দূরত্ব থাকলেও ভারত-ঘেঁষা এই জনপদের মানুষ পায় সরকারি সকল সহায়তা। চরের ফসলী জমির উর্বরতাকে কাজে লাগিয়ে তারা উৎপাদন করে মাসকলাই, ধান, কলা, পাট, ভুট্টাসহ নানান ফসল। অন্যান্য জমির তুলনায় ফলনও হয় ব্যাপক হারে। সবমিলিয়ে ভালোই যাচ্ছিল তাদের। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে পদ্মা নদীতো ভাঙন দেখা দেয়া এই চরের প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। গত ৪ বছরের তুলনায় এবার তীব্র আকার ধারণ করেছে নদী ভাঙন। ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি হারিয়েছে প্রায় হাজার তিনেক পরিবার। তাদের অধিকাংশ নদীর ওপারের নিশিপাড়া চরে নতুন করে আবাসন গড়েছেন। হুমকিতে পড়েছে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা ব্যয়ে গতবছরের সংযোজন করা সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে চরে বিদ্যুৎ সংযোগ। ভারত থেকে বয়ে আসা পদ্মা নদীর তীব্র ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে কয়েক হাজার বিঘা ফসলী জমি ও বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ মসজিদ মাদরাসা। এখন হুমকিতে রয়েছে অন্তত ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ফসলী জমি ও বসতবাড়ি। স্থানীয়দের দাবি, ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়ার পরই ভাঙন-রোধে ভূমিকা নিলে গত ৩ বছর ও চলতি বছরে ভাঙনের তীব্রতা এতো বেশি হতো না। চরের শিবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়নের দশরশিয়া বাজারে দোকানপাট ভাঙতে গেছে স্থানীয়দের। এছাড়াও নদীর কাছাকাছি যাদের বসতবাড়ি চলে এসেছে, তারাও বাড়ির আশেপাশের থাকা গাছপালা কেটে বাড়ি ভেঙে নিয়ে চলে যাচ্ছেন। এই চরে থাকা বাসিন্দারা নদী ভাঙনের কবলে পড়েই এখানে আশ্রয় নিয়েছিল। আবার নদী ভাঙনের কারনেই এই চরে গড়ে উঠা জনপদ ছেড়ে আরেক চরে আশ্রয় নিচ্ছেন পদ্মাপারের বাসিন্দারা। দক্ষিণ পাঁকা গ্রামের আলী বলেন, গত ৪ বছর ধরে নদী ভাঙনের কবলে পড়ে এখানকার মানুষ সব হারালেও তা রোধে কোন ভূমিকা নেয়া হয়নি। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে নদী ভাঙন রোধে কাজ শুরুর কথা বারবার আসলেও তার বাস্তবায়ন দেখতে পায়নি। ইতোমধ্যে এই এলাকায় আমরা অনেকগুলো মসজিদ মাদরাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হারিয়েছি। নদী ভাঙন ঠেকাতে উদ্যোগ নিলে এসব রক্ষা করা সম্ভব হতো। সরকারের নিকট আকুল আবেদন, এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে আমাদেরকে রক্ষা করুন। কলেজ-ছাত্র শামীম রেজা জানান, ভাঙনের কবলে পড়ে দক্ষিণ পাঁকা চরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। যেখানে বাড়ি করেছিলাম সেটি নদী থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিল। কিন্তু ভাঙতে ভাঙতে এখন নদীর খুব কাছে চলে এসেছে। বাধ্য হয়ে আবার বাড়ি ভাঙতে হবে আরেক জায়গায় আশ্রয় নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এক ইঞ্চি জমিও যাতে ফাঁকা না থাকে। তাহলে আমরা কেন নিজেদের এক ইঞ্চি জায়গাও নদীতে ভাঙতে দিব? তাই সরকারের নিকট আকুল আবেদন এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র সুমন আলী বলেন, প্রতিবছর এখানে নদী ভাঙ্গন হচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে সব ঘরবাড়ি ফসলি জমি মসজিদ-মাদ্রাসা নদীর কবলে হারিয়ে যাচ্ছে। এবার ভাঙ্গন বেড়েছে যার কারণে দ্রুত ঘরবাড়ি তলিয়ে যাচ্ছে। এখানে বড় একটা হাট ছিল। সেখানকার অনেক দোকানপাট ছিল। সেই হাটের কিছু অংশ নেমে গেছে, তাই আশেপাশের দোকানগুলো এখন ভেঙে নেয়ার কাজ চলছে। সকাল, বিকেল, দুপুর, রাত কিছুই মানেনা সর্বনাশা পদ্মা নদী। সবসময় ভেঙে যাচ্ছে। নদীর ভাঙ্গনের কবলে পড়ে ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজ ভেঙে যাওয়ার কারণে সব বন্ধ আছে তাদের পড়াশোনা হয় না। বলছিলেন, গৃহবধূ মনিরা বেগম। তিনি আরও বলেন, আমাদের বাড়িও নদীর খুব কাছে চলে এসেছে, তাই বাড়ির আশপাশে থাকা সকল গাছ কেটে ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে চলে যাব। একটি গাছ মানুষ করা, আর একটি ছেলে মানুষ করা প্রায় সমান। যে গাছ এতো যত্ন করে বড় করেছি, তা কেটে ফেলতে হচ্ছে। মানবতার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আকুল আবেদন, দ্রুত এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে এই জনপদকে রক্ষা করুন। ষাটোর্ধ্ব মকবুল হোসেন বলেন, পদ্মা নদীর ভাঙ্গনের নিয়মই এমন। গত কয়েক দশক ধরে আমরা যখন দক্ষিণ দিক ভেঙে যায়, তখন উত্তর দিকে এসে আশ্রয় নেয়। আবার উত্তর দিক ভেঙে গেলে দক্ষিণ আশ্রয় নেয়। এভাবেই চলছে আমাদের জীবনযাপন। একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করলে এভাবে কিছু পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাবে না সবকিছু, আমরা হারাবো না ভিটেমাটি। নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নাজির হোসেন জানান, ২১০৮ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁকা ও নারায়নপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। নারায়ণপুরের তুলনায় পাঁকা ইউনিয়নে বেশি ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে চলতি বছরে। ২০১৮ সালে ভাঙ্গনের শুরুর সময় যদি কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হত, তাহলে ভাঙনের তীব্রতা এবছর এত বেশি দেখা যেত না। ভাঙনের তীব্রতা এমন যে, পাঁকা ইউনিয়নের দুইটি ওয়ার্ড নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঁচটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাঁচটি বিজিবি ক্যাম্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি হুমকিতে রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, দশ রশিয়া থেকে বত্রিশ রশিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ভাঙনটা খুব তীব্র। পানি উন্নয়ন বোর্ড সাধারণত চর এলাকায় কাজ করে না। কিন্তু এই চরের বাসিন্দারা সরকারের সকল সুবিধা পেয়ে থাকেন এবং জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় এমপি মহোদয়ের যোগাযোগের ফলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ভাঙন-রোধে ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে গেলে পাঁচ কিলোমিটারের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। এছাড়াও এখানে পাথর ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে আসা অনেক কষ্টসাধ্য। একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে, তারা কম খরচে কিভাবে স্থায়ী সমাধান সম্ভব তা প্রতিবেদন দিবেন। গত শুক্রবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে ইতোমধ্যে চর পাঁকার পয়েন্ট থেকে ৩৩০ টি জিও টিউব ও ১ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক একেএম গালিভ খাঁন বলেন, জিও টিউব ও জিও ব্যাগ দিয়ে বালু ঢুকিয়ে স্রোতের বাঁধা সৃষ্টি করে ১০টি জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এতে নদী ভাঙন থেকে এই এলাকা রক্ষা পাবে বলে আশা করছি। এছাড়াও জিও ব্যাগে বালু ও সিমেন্ট মিশিয়ে নদী পাড়ে ভাঙন রোধে বাঁধা প্রদানে আরও একটি প্রকল্প হাতে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি, তাদের মনের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। তাদেরকে আশ্বস্ত করেছি, সরকার তাদের পাশে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার নির্দেশ হলো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তাই সরেজমিনে এসে তাদের সাথে কথা বলেছি তাদের দুঃখ-দুর্দশা অসহায়ত্বের কথা শুনেছি৷ খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, সরকারের সকল সুবিধা তারা পাচ্ছে। এছাড়া নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝেও সহায়তা প্রদান করা হবে। নদী ভাঙ্গন রোধে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বরাদ্দের কাজ কঠোরভাবে তদারকি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।