শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঝিনাইদহে পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক কামান্না দিবস

প্রকাশিত : নভেম্বর ২৬, ২০২২ , ৭:২৮ অপরাহ্ণ

হেলালী ফেরদৌসী, নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন: ১৯৭১ সালের এ দিনে ঝিনাইদহের তৎকালিন শৈলকুপা থানা সদর থেকে ৮-৯ মাইল পূর্বদিকে কুমার নদী ঘেঁষে কামান্না গ্রামে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হন ২৭ মুত্তিপাগল যুবক ও এক গৃহবধূসহ ২৯ ব্যক্তি। বগুড়া ইউনিয়নের সবুজে ঘেরা এ গ্রামটিতে ঘটে যায় ইতিহাসের হৃদয়বিদারক ও ঘৃণ্যতম ঘটনা। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছরের মত এবারও পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক কামান্না দিবস। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী জানান, ১৯৭১ সালের ২৫নভেম্বর রাতে ৩৫ জনের মত স্বাধীনতাকামী যুবক সেনা কর্মকর্তা শমসের হোসেনের নেতৃত্বে আশ্রয় নেন কামান্না হাইস্কুলের পশ্চিমদিকে মাধব ভৌমিকের বাড়িতে, কেউ আবার পার্শ্ববর্তী কিরণ শিকদারের বাড়িতে। (মাধব ভৌমিকের বাড়িটি অবশ্য এখন ওই গ্রামের কেবি জামান ওরফে পানু কাজি কিনে নিয়েছেন)। নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য হওয়ায় রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ না করেই তারা ঘুমিয়ে পড়েন যার যার মত। খবরটি শৈলকুপা রাজাকার ক্যাম্পে পৌঁছাতে আর বিলম্ব হয় না। শোনা যায়- পাকিস্তানী বাহিনীর অনুগত চর হিসেবে “মহান দেশপ্রেমের” কাজটি করেন গ্রামের এক স্কুলশিক্ষক। যদিও বর্তমাণে তিনিও আর ইহজগতে নেই। মহান মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী কামান্নায় যাচ্ছে- এ খবরটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠানো হলেও কোন অজানা কারণে শেষতক তা আর কামান্নায় মুক্তিযোদ্ধাদের কানে পৌঁছেনি। ফলে তৎকালিন মহকুমা শহর ঝিনাইদহ, থানা শহর শৈলকুপা আর পার্শ্ববর্তী মাগুরা থেকে কয়েকশ হানাদার বাহিনীর সদস্য ও তাদের স্থানীয় সহচর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস মাঝরাত থেকেই ঘিরে ফেলে মাধব ভৌমিকের বাড়ি, আশেপাশের এলাকা, অবস্থান নেয় ভারি অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে। রাত ভোর হবার কয়েকঘন্টা আগেই তারা অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমকাতুরে দামাল ছেলেদের ওপর। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে বীর সন্তানদের। কিন্তু অস্ত্র হাতে থাকলেও তা থেকে গুলি বের করে হানাদারদের মোকাবিলা করার সুযোগ থাকে না তাদের। ফলে হায়েনাদের গুলি আর বেয়নেটের আঘাতে ঝরে পড়ে একে এক ২৭ মুত্তিপাগল যুবকের প্রাণ, কামান্নার ব্যবসায়ী কিরণ শিকদার আর গৃহবধূ রঙ্গনেছার। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন কিরণ শিকদারের বাড়িতেও আশ্রয়ে ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছিলেন। এলাকাবাসী জানান, কিরণ শিকদার প্রতিদিনের মতই নদীর পাড়ে প্রাকৃতিক কাজ সারতে গিয়েছিলেন আর রঙ্গনেছা তার নতুন জামাইয়ের জন্য পিঠে বানানোর আতপ চাল ধুতে গিয়েছিলেন নদীর ঘাটে। তাদের শত্রু ভেবেই হানাদাররা গুলি করে হত্যা করে মনের সাধ মেটায়। হানাদারদের গুলিতে আরো বেশ ক’জন মুক্তিপাগল যুবক আহত হন। গুলিতে আহত আব্দুর রহমানসহ বেশ কয়েকজনকে ওই সময় মায়ের মমতায় সেবা দিয়েছিলেন পানু কাজির মা রাবেয়া খাতুন ওরফে সোনা কাজি, ছোটবোন বেনু এবং কাজি সিরাজ নিজে। ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা বারইহুদা গ্রামের কলেজ-ছাত্র বিশ্বাস লুৎফর রহমান যিনি পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম-সচিব হয়ে অবসরে গেছেন, তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে ছয়টি গণকবরে সমাহিত করেন মোমিন, কাদের, শহিদুল ইসলাম, সলেমান, আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল ওয়াহেদ, রিয়াদ, আলমগীর হোসেন, আব্দুল মোতালেব, আলী হোসেন, শরিফুল ইসলাম, আনিসুর রহমান, আলিমুজ্জামান, তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান, নাসিম, রাজ্জাক-২, কওসার আলী, আব্দুল মালেক, আব্দুল আজিজ, আকবর হোসেন, সেলিম, হোসেন, রাসেদ, গোলজার আহমেদ, অধির ও গৌরকে। এদের অধিকাংশই মাগুরা জেলার হাজিপুর ও শ্রীপুর উপজেলার সন্তান। গণ-কবরস্থানে একটি আধুনিক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয় এবং শহীদ ২৭ মুক্তিযোদ্ধার নামের সাথে গৃহবধূ রঙ্গনেছার নামটিও শহীদ হিসেবে কেন লেখা হয়েছে তা আজও মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেনি। রক্তের কার্পেট এতই পুরু ছিল যে তা অপসারণেও সময় লাগে বহু। কামান্নায় ২৭ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি ও গণকবর ঘিরে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি যাদুঘর নির্মাণ ও এলাকাটিকে দেশের সব মানুষের কাছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অবহিত করা এবং একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের। গতবছর (২০২১) কামান্নায় ২৭ শহীদ স্মৃতি দিবস পালন উপলক্ষ্যে বাড়িটির মালিক পানু কাজির ছেলে লেফটেনেন্ট কর্নেল কাজি শাহিনুজ্জামান রাসেল পাঁচ শতাংশ জমি দান হিসেবে লিখে দেন ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের নামে। কামান্নায় মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর নির্মিত হবে এ কারণে জমিটি লিখে দেয়া হয় বলে জমি-দাতা কাজি শাহিনুজ্জামান রাসেল জানান। ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারি কমিশনার ভ’মি পার্থপ্রতীম শীল দানকৃত জমির দলিল বুঝে নেন। কামান্না দিবস পালন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা কামরুজ্জামান লাল জানান, স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কামান্না ২৭ শহীদ স্মৃতি সংঘের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ শৈলকুপা উপজেলা কমান্ডের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) বনি আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য সভায় ঝিনাইদহ- ১ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন। শৈলকুপা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এম আব্দুল হাকিম আহমদ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ শৈলকুপা উপজেলা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার রহমত আলী মন্টু এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ শ্রীপুর উপজেলা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বিশ্বাস ইকরাম আলী বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।প্রতিবছর ২৬ নভেম্বর আসে, পালিত হয়, দিনটি চলে যায়। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ দিনটি ঘিরে তাদের কথিত ভালোবাসার প্রমাণ দিতে (!) দিনটিকে ২৬ নভেম্বরের বদলে ২৭ নভেম্বর করতে চায়। বিশেষ একটি গোষ্ঠীর এজেন্ডা তারা বাস্তবায়ন করতে অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মাগুরা জেলা ইউনিট কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মোল্যা নবুয়ত হোসেন হুশিয়ার করে দিয়েছেন শৈলকুপার কথিত এক মুক্তিযোদ্ধা নেতাকে। আবার মুক্তিযুদ্ধের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত নন এমন সব পরিবারের সদস্য বা ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকায় নাম লিখিয়েছেন, স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছেন বা পরিচয় দিচ্ছেন এটাও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মনে। তারা আসছে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগেই এসবের সমাধান চান।