১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৯, ২০২২ , ৭:৪৫ অপরাহ্ণ

মোঃ আজিজুর রহমান ভূঁঞা বাবুল, ব্যুরো প্রধান, ময়মনসিংহ, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন: ১৯৭১ এর মার্চের শুরু থেকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষজন নিজেদের মাটিকে রক্ষা করতে সেইসাথে পাক-হানাদার ও তাদের দোসরদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে জান-প্রাণ দিয়ে আপ্রাণ লড়াই করে গেলেও একটা সময়ে পাক-হানাদারদের অত্যাচার নির্যাতন আর ভারী অস্ত্রের সামনে ঠিকতে না পেরে পরবর্তীতে মরণ-কামড় দিয়ে বাংলার মাটিকে মুক্ত করে আনে। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর এই দিনে পাক হানাদার ও তাদের দোসরদের পরাজিত করে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা মুক্ত করেছিল ময়মনসিংহ শহর। এরপর থেকেই প্রতিবছর দিনটি ‘ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন দলিল দস্তাবেজ,স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সংগঠকবৃন্দের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে উঠে আসা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
মা-মাটিকে মুক্ত করতে রক্তঝরা ১৯৭১ এর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নেত্রকোনা থেকে একটি গ্রুপ ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হয় হতে থাকে। একই সময় হালুয়াঘাট, ফুলপুর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল হয়ে মিত্র বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের আরেক একটি দল ময়মনসিংহ জেলাকে শত্রু-মুক্ত করতে অগ্রসর হয় হতে থাকে।ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে জানবাজী রেখে এ মাটিতে মুক্ত করার প্রথম যুদ্ধেই মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলা ৭ ডিসেম্বর মুক্ত করতে সক্ষম হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৮ ডিসেম্বর গৌরীপুর,ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা, ৯ ডিসেম্বর ত্রিশাল, ফুলপুর, ঈশ্বরগঞ্জ ও গফরগাঁও,১০ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলা শহর ও মুক্তগাছা এবং সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর নান্দাইল উপজেলা পাক-হানাদার মুক্ত করতে সক্ষম হয়।
১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর এই দিনে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনী, ছাত্র, কৃষক ও আমজনতা সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া মুক্ত করে মিছিল বের করে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠে। এরপর ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান তুলে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা মাতিয়ে তুলে সীমান্তবর্তী এই দুই উপজেলা। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া অবস্থান হওয়ায় গারো পাহাড়ের পাদদেশে হালুয়াঘাটে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে উঠে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। এছাড়াও অঞ্চল ভিত্তিক আন্দোলন সংগ্রাম এবং প্রতিরোধের দুর্গগড়ে তোলা হয় যুদ্ধের শুরু থেকেই। ১৯৭১ সালের এই দিনে আলবদর, রাজাকার, পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এদেশের মুক্তিবাহিনী, ছাত্র, কৃষক, সর্বস্তরের জনতা সশস্ত্র যুদ্ধ করে মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলা মুক্ত করে ৭ই ডিসেম্বর হালুয়াঘাটের আঞ্চলিক সংগঠক সীমান্ত-বন্ধু মরহুম কুদরত উল্লাহ মন্ডল হাজার হাজার জনতার সামনে হালুয়াঘাট ভূমি অফিসের সামনে জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করে হালুয়াঘাট অঞ্চল-শত্রু মুক্ত ঘোষণা করেন। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা ও হাজারো জনতার ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে শ্লোগানে এলাকা মুখরিত হয়ে উঠে। এদিকে ৭ ডিসেম্বর ওই দিন ধোবাউড়া উপজেলা সদর থেকে ২ কিলোমিটার দক্ষিণে তাড়াইকান্দি গ্রামে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালালে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোজাম্মেল হোসাইন ও মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মমতাজুর রহমান খানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত করে ধোবাউড়াকে মুক্ত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৮ ডিসেম্বর গৌরীপুর, ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা, ৯ ডিসেম্বর ত্রিশাল, ফুলপুর, ঈশ্বরগঞ্জ ও গফরগাঁও,১০ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলা শহর ও মুক্তগাছা এবং সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর নান্দাইল উপজেলা পাক-হানাদার মুক্ত করতে সক্ষম হয়। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর এই দিনে পাক হানাদার ও তাদের দোসরদের পরাজিত করে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা মুক্ত করেছিল ময়মনসিংহ শহর। এই দিনের ভোর বেলা থেকেই মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা বীরের বেশে জাতীয় পতাকা হাতে শম্ভুগঞ্জ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে দলে দলে সার্কিট হাউজ মাঠে জমায়েত হতে থাকে। অবরুদ্ধ শহরবাসী এ খবর পেয়ে আনন্দ উল্লাসে রাস্তায় নেমে আসে। একদিকে বিজয় উল্লাস অন্যদিকে স্বজন হারানোর বেদনা সব মিলিয়ে দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবুও দিনটি ছিল অত্যন্ত খুশির, আনন্দের ও মুক্তির দিন। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল জানান, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষণের পর থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ময়মনসিংহকে দখলমুক্ত রেখেছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তবে ২৩ এপ্রিল ময়মনসিংহের পতন ঘটলে শহর ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তসহ সীমান্তের ওপারে চলে যায় মুক্তিযোদ্ধারা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি ভবনে স্থাপন করা হয় পাক হানাদার বাহিনীর বিগ্রেড হেড কোয়ার্টার। হানাদারদের সহযোগী হিসাবে গড়ে তোলা হয় আলবদর, আল সামস, রাজাকার বাহিনী। জেলা পরিষদ ডাক বাংলোটির ‘শান্তি ভবন’ নাম দিয়ে টর্চার সেল ও কিলিং সেন্টার গড়ে তোলে।ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে গড়ে তোলে আরও ২টি আস্তানা। এছাড়াও অবাঙ্গালী বিহারিরা শহরের ছোট বাজারে গড়ে তোলে “কিলিং জোন”। ৭১ এ পাক সেনা আর রাজাকার, আল বদররা এসব আস্তানায় বাঙ্গালী নিধনে মেতে উঠে ছিল। প্রতিদিনের সেই নৃশংসতার নিদর্শন দেখা যেত ব্রহ্মপুত্রের চরে। মুক্তাগাছা, গৌরীপুর ও নান্দাইলের এই নৃশংসতার মাত্রা ছিল আরো ভয়াবহ। প্রায় ৭ মাস পাক সেনাদের দখলে থাকার পর নভেম্বরের শেষের দিকে এসে মুক্ত হতে থাকে ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলা। আর এরই ধারাবাহিকতায় বীর মুক্তিযোদ্ধা (সাবেক মন্ত্রী)অধ্যক্ষ মোঃ মতিউর রহমান ও মিত্রবাহিনীর কমান্ডার বাবাজির নেতৃত্বে শহরে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহ শহরকে হানাদার মুক্ত করেন।১০ই ডিসেম্বর ময়মনসিংহ-বাসীর জীবনে একটি অবিস্মরণীয় দিন হয়ে উঠে। আর ১০ই ডিসেম্বর সার্কিট হাউজ মাঠে বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন সাবেক ধর্ম-মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মোঃ মতিউর রহমান।
যেভাবে মুক্ত হয় ময়মনসিংহ:
ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহে নেত্রকোনা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ অগ্রসর হয় ময়মনসিংহের দিকে। একই সময় হালুয়াঘাট, ফুলপুর হয়ে মিত্র বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের আরেক একটি দল অগ্রসর হয় শহরে অভিমুখে। ৯ই ডিসেম্বর রাতে ২টি দল অবস্থান নেয় ব্রহ্মপুত্রের ওপারে শম্ভুগঞ্জে।মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর অবস্থান টের পেয়ে শহরে কারফিউ জারী করে হানাদাররা। অপরদিকে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকার দিকে পালিয়ে যায় পাক সেনারা। ১০ই ডিসেম্বর সকালে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করে। মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ঢালু যুব শিবির প্রধান বীর-মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এবং মিত্রবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন বিগ্রেডিয়ার সামস শিংহ বাবাজি। এই দিনটিকে স্মরণ করে রাখতে ১৯৮৩ সালে ময়মনসিংহ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ‘ময়মনসিংহ মুক্ত দিবস’ পালন করতে উদ্যোগ নেন। ১৯৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথমবারের মত দিনটি পালন শুরু করতে পারি। এর পর থেকে প্রতি বছর প্রথমে এক দিন থেকে তিন দিন এবং পরে তিনদিন থেকে সাত দিনব্যাপী কর্মসূচীর মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। যা বর্তমানে শহরের ছোট বাজার বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা স্মরণীতে পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও এ দিনটি উপজেলা ও জেলা প্রশাসন ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আয়োজনে বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে পালিত হবে।