বাঁওড়পাড়ে মৎস্যজীবীদের মানববন্ধন

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৩, ২০২৩ , ৫:৫৯ অপরাহ্ণ

হেলালী ফেরদৌসী, নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন: ঝিনাইদহের ৬টি বাঁওড় রক্ষায় হালদার সম্প্রদায়ের মৎস্যজীবীরা কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। প্রতিদিন তারা বাঁওড় পারে মানববন্ধন ও সমাবেশ করছেন। সোমবার কোটচাঁদপুরের বলুহর প্রজেক্ট এলাকায় এমন মানববন্ধনে হাজির হন ৭৭ বছর বয়সী শ্রী নরেন হালদান, যার ৬৮ বছরই কেটেছে জাল দড়া টেনে। মানববন্ধনে হালদার সম্প্রদায়ের কয়েক’শ মানুষ উপস্থিত হয়ে তাদের পেটে লাথি না মারার আকুতি জানান। মানববন্ধনে সুধীর হালদার নামে এক মৎস্যজীবী বাস্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, হালদার সম্প্রদায় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে বলে এসেছেন “হয় বিষ দ্যান না হয় বাঁওড়ের মালিকানা দ্যান”। বাপ দাদার কর্মক্ষেত্র বলুহর বাঁওড় ইজারা দেয়া হলে তারা স্বেচ্ছায় আত্মাহুতির কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলেও জানান এই মৎস্যজীবী। তাদের ভাষ্য, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমল থেকে তারা বাঁওড়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই বৃদ্ধ বয়সেও বৃহৎ একটি পরিবার তাদের আয়ের উপর নির্ভরশীল। জীবন সায়াহ্নে এসে তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন বলুহর বাঁওড়ের মালিকানা হারাতে বসেছে। তথ্য নিয়ে জানা গেছে, জেলা প্রশাসন টেন্ডারের মাধ্যমে বাঁওড়গুলো ইজারাদানের পক্রিয়া চালাচ্ছে। ফলে কর্ম হারানোর প্রহর গুনছেন বাঁওড়পাড়ের হাজারো মৎস্যজীবী পরিবার। শুধু নরেন হালদার নয়, তার মতো বাঁওড় পাড়ের রহমতপুর গ্রামের সাধন হালদার, বলুহর গ্রামের নিত্য হালদার, শ্রীমতি কমলা রানী হালদার, বজরাপুর গ্রামের সন্তোষ কুমার হালদারসহ জেলার ৬টি বাঁওড়ের উপর নির্ভরশীল প্রায় ৫ হাজার মানুষের মাঝে নেমে এসেছে চরম হতাশা। মৎস্যজীবীরা জানান, সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় ঝিনাইদহের ৬টি বাঁওড় ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাঁওড়গুলো হচ্ছে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাঠগড়া, ফতেপুর, কোটচাঁদপুরের বলুহর, জয়দিয়া, কালীগঞ্জের মর্জাদ এবং বেড়গোবিন্দপুর। এ সব বাঁওড়ের মোট জলাকার হচ্ছে ১১৩৭ হেক্টর। ৬টি বাঁওড় এলাকায় ৭৬৭টি পরিবারের প্রায় ৫ হাজার সদস্য এ সব বাঁওর থেকে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। মৎস্যজীবীরা সরকারের “জাল যার জলা তার” এই নীতির উপর ভর করে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে বাঁওড়ে মাছ ধরে আসছিলেন। সুফল-ভোগী মৎস্যজীবী সুধীর হালদার জানান, বাঁওড় ইজারা দিলে সরকারের এককালীন বেশি টাকা আয় হলেও একদিকে যেমন বাঁওড়গুলো ক্ষতির মুখে পড়বে, তেমনি মালিকানা হারিয়ে পথে বসবে বাঁওড়ের উপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবার। ফলে ধ্বংস হবে জীব-বৈচিত্র্য। বাঁওড়গুলো চলে যাবে প্রভাবশালী মধ্যসত্বভোগীদের দখলে। ইতিমধ্যে একটি মাফিয়া-চক্র বাঁওড়গুলো ইজারা নিতে কোমর বেধে মাঠে নেমেছে। ভুঁইফোড় সমিতির নামে কোটি কোটি টাকার ডাক তুলে সিডি জমা দেয়া হয়েছে। সুধীর হালদার অভিযোগ করেন, কোটচাঁদপুরের শীতল হালদার নামে এক ব্যক্তি দুই কোটি ৩৭ লাখ টাকার বিপরীতে সিডি জমা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এই টাকার জোগানদাতা কারা ? শীতল হালদারের পেছনে কারা টাকার যোগান দিচ্ছে ? এ বিষয়ে বিল বাঁওড় প্রকল্প পরিচালক মোঃ আলফাজ উদ্দিন শেখ জানান, মৎস্য বিভাগ চেষ্টা করছে বর্তমান প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করে চলমান নিয়মে মাছের চাষ করা। কিন্তু ভূমি মন্ত্রণালয় এগুলো ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা চূড়ান্ত ভাবে বাস্তবায়িত হলে হাজারো হালদার পরিবার পথে বসবেন। ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মনিরা বেগম জানান, বাঁওড়পাড়ের মানুষগুলোর কথা চিন্তা করে ভূমি মন্ত্রণালয় মৎস্য অধিদপ্তরের এক প্রকল্পের মাধ্যমে মাছ চাষের জন্য দিয়েছিল। কিন্তু তারা সফলতা আনতে পারেনি। বাঁওড়পাড়ের হলদারদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলবেন বলে তিনি জানান। বিষয়টি নিয়ে কোটচাঁদপুর মহেশপুর এলাকার সংসদ সদস্য এড শফিকুল আজম খান চঞ্চল জানান, আগামী ৩১ জানুয়ারি বিষয়টি নিয়ে আন্তঃ মন্ত্রণালয়ে সভা হবে। সেখানে বিষয়টি উঠবে। তিনি বলেন, বাঁওড়গুলো ইজারা দিলে সরকার হয়তো এককালীন টাকা পাবে, কিন্তু হালদার পরিবারগুলো কোথায় যাবে ? এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি দ্ব্যর্থ-হীন কণ্ঠে জানান, জনপ্রতিনিধি হিসেবে বাঁওড় রক্ষায় যা যা করার তাই তিনি করবেন।