নোয়াখালীতে ইয়াবা দিয়ে কলেজ ছাত্রকে ফাঁসানোর অভিযোগে আদালতে মামলা : পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২২ , ৮:৪০ অপরাহ্ণ

কলেজ ছাত্র শামীম।

ইয়াকুব নবী ইমন, নিজস্ব প্রতিনিধি, নোয়াখালী, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন: নোয়াখালীতে দাবীকৃত টাকা না পেয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ী সাজিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে কলেজ ছাত্রকে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে নোয়াখালী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ৬ সদস্যের বিরুদ্ধে। একটি সরকারী গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী কলেজ ছাত্র শামীম আহাম্মদের পিতা বাদী হয়ে দায়ের করা মামলা পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারও বিষয়টি তদন্ত করছেন। ন্যায় বিচার চেয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবী ভুক্তভোগী কলেজ ছাত্র শামীম আহাম্মদ, পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর। বিষয়টির তদন্ত চলছে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে পুলিশ সদস্য হলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার। সরেজমিন গিয়ে এলাকায়, ডিবি কার্যালয়ে ও ভুক্তভোগী কলেজ ছাত্র শামীম ও স্বজনদের সাংবাদিক সম্মেলনের দেয়া লিখিত বক্তব্যে জানা যায়, বেগমগঞ্জ উপজেলার কাজীনগর গ্রামের সাবেক পুলিশ সদস্য বদিউল আলমের পুত্র নোয়াখালী সরকারী কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র শামীম আহাম্মদ পড়া লেখার পাশাপাশি কাজীনগর রাস্তার মাথায় একটি কনফেকশনারী দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পিতা সাবেক পুলিশ সদস্য হিসেবে পুলিশের প্রতি শামীমের আলাদা ভালোবাসা কাজ করতো। এরিমধ্যে কাজীনগর এলাকায় মাদক বিরোধী অভিযানে আসা গোয়েন্দা পুলিশের এস.আই সাইদ মিয়া ও সাকিদুল ইসলামের সাথে পরিচয় হয় শামীমের। এ সূত্র ধরে পুলিশ সদস্যরা পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে শামীমকে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতে বললে শামীম রাজি হয়। এরপর শামীমের তথ্যে মাদক বিরোধী একাধিক সফল অভিযানও পরিচালনা করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে গত ২৬ জালাই দুপুরের একটি অভিযানে। ওই দিন ডিবি পুলিশের দেয়া ২০ হাজার টাকা নিয়ে শামীম ও তার আরেকজন সহযোগী সিএনজি ড্রাইভার পারভেজসহ ইয়াবার ক্রেতা সেজে জেলার হরিনারায়নপুর এলাকায় বিক্রেতার কাছে যায়। এ সময় শামীম মোবাইলে ও হোয়াটস আপে ডিবি পুলিশের এস.আই সাইদ মিয়া, এএসআই সাকিদুল ইসলামকে ইয়াবা ক্রয় বিক্রয়ের লোকেশন দিলেও তারা যথাসময়ে পৌঁছাতে না পারায় ইয়াবা বিক্রেতাকে আটক করতে ব্যর্থ হয়। পুলিশ আসার আগেই বিক্রেতা শামীমের বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে ২০ হাজার টাকা নিয়ে শামীম ও তার সহযোগীকে ১৪০ পিস ইয়াবা দিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। মাদক ব্যবসায়ীকে ধরতে না পেরে ক্ষিপ্ত এস.আই সাইদ মিয়া ও এএসআই সাকিদুল ইয়াবা ব্যবসায়ীর রেখে যাওয়া ১৪০ পিস ইয়াবাসহ শামীম ও তার সহযোগী পারভেজকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসে। এ সময় শামীমের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ডিবি পুলিশ সদস্যরা ৫০ হাজার টাকা দাবী করে। (যার অডিও কল রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে) ওই দিন রাতে শামীমের পিতা এস.আই সাকিদুলের হাতে ২০ হাজার টাকা তুলে দিলে আরও ২০ হাজার টাকা নিয়ে সকালে এসে শামীমকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে। সকালে শামীমের পিতা আরও ২০ হাজার টাকা নিয়ে ডিবি অফিসে গেলে টাকা না নিয়ে রাতে নেয়া ২০ হাজার টাকার থেকে ১০ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে শামীম ও তার সহযোগী পারভেজকে মাদক মামলায় জেলে পাঠায়। প্রায় দেড় মাস শামীম জেল খেটে জামিনে আসে। ডিবি কার্যালয়ে শামীমকে ইলেকট্রিক হিটসহ বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করা হয় বলে শামীম অভিযোগ করে।
এদিকে নিরপরাধ পুত্র শামীমকে মিথ্যা মাদক মামলা দিয়ে ফাঁসানোয় পিতা বদিউল আলম বাদী হয়ে বিজ্ঞ বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ১নং আমলি আদালতে ডিবি পুলিশের ৬ সদস্য এসআই সাইদ মিয়া, এএসআই সাদিকুল ইসলাম, রাকিবুল ইসলাম, জাহেদুল ইসলাম, পুলিশ সদস্য সেলিম মিয়া ও শামছুদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যার পিটিশন মামলা নং-৭৩১/২০২২, তাং-১-৮-২০২২ইং, ধারা ৪২০/৩৮৮ দণ্ডবিধি। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে নোয়াখালী পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। এছাড়াও পুলিশের আইজি, ডিআইজি, ও পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিষয়টি তদন্ত করছেন। এ নিয়ে জেলা-ব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় ন্যায় বিচার চেয়েছে ভুক্তভোগী কলেজ, তার পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। মামলার বাদী কলেজ ছাত্র শামীমের পিতা বদিউল আলম জানান, আমি একজন সাবেক পুলিশ সদস্য। আমার ছেলের সাথে, আমার সাথে উনারা যে আচরণ করেছেন তা নিন্দনীয় ও দু:খজনক। আমার ছেলে যদি এসব খারাপ কাজের সাথে জড়িত থাকতো তাহলে আমি নিজেও জানতাম। এলাকার মানুষজনও জানতো। আমি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবী করছি। স্থানীয় ইউপি মেম্বার জানান, শামীমের দোকানে মাঝে মধ্যে ডিবি পুলিশকে আসতে দেখতাম। গল্প গুজব করতো। পরবর্তীতে শুনি তাকে নাকি মাইজদীতে ইয়াবাসহ আটক করে জেলে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আমরা কখনো শামীমকে এসব সাথে জড়িত থাকতে দেখিনি। একই কথা জানান, শামীমের পার্শ্ববর্তী একাধিক দোকানদার। এ বিষয়ে জানতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে গেলে অভিযুক্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে চেষ্টা করেও বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো: শহীদুল ইসলাম জানান, যেহেতু মামলা হয়েছে। আমাদের নিজস্ব তদন্ত ও পিবিআই মামলা তদন্ত করছে। বিষয়টি গুরুত্ব-সহকারে দেখা হচ্ছে। আইনের কোন ব্যাঘাত ঘটলে অভিযুক্ত যেই হোক তাদের আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।