প্রশংসাই প্রেরণা : কাজ হোক সাদকাহ

প্রকাশিত : মার্চ ৩, ২০২৪ , ১০:৫৬ অপরাহ্ণ

প্রতিকি চিত্র।

।।এক।।
আমি যে একটা হ্যাডম-সেটা বোঝানোর জন্যও মানুষের প্রয়োজন আটকে রাখি। অথচ একটু সদিচ্ছাতেই আমার কাজটি সাদকাহ হতে পারে! ক্ষমতার যদি অপব্যবহার করি তবে যিনি ক্ষমতা দিয়ে সম্মানিত করেছেন সেই তিনিই আবার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে লাঞ্ছিত করতে পারবেন না? আমার মধ্যে কি আমার যোগ্যতার দম্ভ ভর করেছে? অথচ আমার চেয়ে কত যোগ্য আমার বয়সেই কবরে শুয়ে গেছে। একটা মাঝারি বেতনের চাকুরি না পেয়ে জীবনকে ঘৃণা করছে-তেমন দৃষ্টান্তও কি আশেপাশে নাই? ক্লাসে আমার চেয়ে মেধাবী ছিল অথচ কবেই জীবনের দৌড় থেকে ছিটকে পরেছে! কোন দাম্ভিকতায় আমার নিম্ন চেয়ারের, সাধারণ মানুষ কিংবা সেবাগ্রহীতাকে অসম্মান করি? কোন বোধ সামর্থ্যের মধ্যে থাকা উপকার করা থেকে আমাকে বিরত রাখছে? আমি এমন কে?

দায়িত্ব যত বড় তাঁর ব্যস্ততা তত বেশি। তার মাঝেও আন্তরিকতার সাথে, প্রয়োজন বুঝে পরের প্রয়োজনটা বুঝতে হয়। ক্ষমতায় থেকে ধমক দেয়াটাই সহজ! তব চমক তো নীরবতায়। সৌন্দর্য তো আন্তরিকতায়। মাধুর্য তো কোমলতায়। ক্ষমতার দৈর্ঘ্য কত যুগ? জীবনের ওপারে তো আর ক্ষমতা থাকবে না। অথচ দোয়াটা সাদকায়ে জারিয়া হয়ে কালান্তর থাকবে। অমুকে ভালো লোক ছিল-এর চেয়ে বড় কোন প্রাপ্তি নাই। মরণের খবর শুনে কেউ একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে-এর চেয়ে বড় সম্মান আর কিছুতেই নাই। এটাও সত্য যে, সবাইকে খুশি করা যাবে না তবে আমার ইচ্ছাকৃত কোন আচরণ কারো মন খারাপের কারণ না হোক। কেউ যাতে আমার ছায়া দেখে মনে মনেও বলতে না পারে, ব্যাটা বদ!-তেমন চেষ্টাটুকু নিরন্তর হোক। জীবনের সাথে সাময়িক পালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া চেয়ার, যশ-খ্যাতি কিংবা পদ-পদবি যেন মানুষের কাতার থেকে টেনে নিয়ে না যায় অমানুষের পালের দিকে! বিত্ত-সম্পদ যেন মুক্তির পথে কাঁটা না হয়!

সুযোগ অবারিত-সৎ থাকবেন নাকি অসৎ হবেন। হালাল রুজি ও রিজিকের আলাদা বারাকাহ আছে। মানসিক তৃপ্তির চেয়ে বড় নেয়ামত একজীবনের জন্য আর একটাও নাই। কারো অধিকার হরণ করে, কাউকে বঞ্চিত রেখে, দায়িত্বে অবহেলা করে, রাষ্ট্রীয় আমানত চুরি করে সেই অর্থে সন্তানদেরকে মানুষ করে গড়ে তুলবেন? গায়ে-পায়ে বড় হলেই মানুষ হওয়া যায় না। সন্তানদের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়ার চেয়ে যোগ্য করে যান, সততা-সরলতার মূল্য শেখান-তবেই কল্যাণ হবে। জীবনের গলিপথে বিবেকের ছাপ থাকতে হয়, সত্যের খুঁটি দাঁড় করাতে হয় এবং লোভ সংবরণ করতে হয়। অস্থায়ী একটা জীবনের জন্য স্থায়ী পাপ করলে তার তাপ জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছাবে। যে খাদ্য দৈহিক সুস্থতা দেবে সেটাই যখন মানসিক অসুস্থতা বহন করবে তখন সুখের তালাশ করা অতোটা সহজ কাজ নয়

।।দুই।।
আমরা স্বভাবজাত ভাবেই যেভাবে পাকাপোক্ত সমালোচনা করতে পারি সেভাবে প্রশংসা করতে পারি না। একজন মানুষের দ্বারা উপকৃত হয়েছি অথচ সেখানে কৃতজ্ঞতা থাকবে না-এটা কাম্য আচরণ নয়। দুই-তিন সেকেন্ড খরচ করে যদি প্রশংসাটুকু করে ফেলি, মিনিমান ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি তবে একজন ভালো কর্মী যে কতদূরে পৌঁছাবে তা আগাম আন্দাজ করাও মুশকিল। প্রশংসাই প্রেরণা। সমালোচনা করার হলে সেটা গোপনে করাতেই আদব নিহিত। একজন মানুষের দুর্নাম করলে তার কর্মক্ষমতা কমে যায়, কর্মদক্ষতা হৃাস পায়। চলার পথে বন্ধুরতা সৃষ্টি হয়। একজন মানুষকে দমিয়ে দেয়ার জন্য তার নিন্দা করাই যথেষ্ট। নিন্দার পেছনে বাস্তব ভিত্তি থাকলেও সেটা আয়োজন করে প্রকাশ কাম্য নয়। কোন মানুষেই অজ্ঞাত ভুলে ঊর্ধ্বে নয়।

পাশাপাশি চলতে গেলে টোকাটুকি হতেই পারে! তবে বড় হওয়া আর ভালো সাজতে গিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা মানুষকে বিবেকহীন করে ফেলে। তখন কথা ব্যথা দেওয়ার অস্ত্র হয়। আচরণে ভর করে ঔদ্ধত্য। অথচ মাধুর্য মাখা থাকে সততায়। কাউকে ভালবাসলে তবেই তো ভালোবাসা আশা করতে পারি। যদি দোষ ধরার জন্য ওঁৎপেতে বসে থাকি তবে মানবিক সম্পর্ক এগুবে না। সহকর্মী সহমর্মির ভূমিকায় পৌঁছাবে না। ওপর-নিচ মিলিয়ে যখন টিম হবে তখনই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ধরা দেবে। নয়তো দিনের মনে দিন খোয়া যাবে, কাজের ফলাফলে শূন্য। এসবের অন্য মানেও খোঁজা যায় তবে সামনের জীবন অনন্যের পথে গড়াবে না।

।।তিন।।
আমরা যে কথা বলি, যে কাজ করি, সেটার জন্য দুনিয়ায় পারিশ্রমিক আছে বটে তবে মূল বিনিময় ওপারে-ওধারে। দুনিয়ায় পালন করে যাওয়া দায়িত্ব, অপরকে দেওয়া সৎ পরামর্শ, বিপন্নকে সাধ্যমত সাহায্য-এসব সাদকাহ হয়ে ফিরে যায় রুহের দিকে। যতক্ষণ কর্তাকে সে রাজ্যে না পায় ততক্ষণ কল্যাণ হয় মাতা-পিতার এবং নিকটাত্মীয়ের মৃত আত্মার জন্য। ক্ষয়ে দিতে থাকে জীবিতের পাপ। ভালোকাজ কেবল ওপারের ফলাফলই আনে না বরং এপারেও বিপদ থেকে মুক্তি দেয়। দুর্ঘটনা থেকে দূরে রাখে। রবের সাথে আপনার পক্ষ হয়ে ভালো রাখার চুক্তি করে! সৎকাজ, ভালো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজ মানুষের পাপকে কাটিয়ে দেয়। জীবনের ঘরে বাইরে বারাকাহ’র সাকিনা নাযিল হয়।

যেখানে কথা-কাজ ইবাদাত সেখানে ভালোকাজের প্রতিযোগিতা থাকা দরকার। অথচ লোভের মোহজালে আমরা মন্দের উঠোনে প্রতিযোগিতা করছি। নিজে ডুবছি এবং আহাল ও আয়ালকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছি। অবৈধ পথে যে সম্পদ জমা করছি তা নিজের ও সন্তানদের বিনাশের কারণ হবে। অন্যায় পথে উপার্জিত অর্থ, কারো অধিকার ছিনিয়ে রাখা স্বার্থ-এসব কোনকালেই কারো জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি। বাহির থেকে সুরম্য অট্টালিকায় আয়েশি জীবন মনে হতে পারে কিন্তু ভেতরে অশান্তির দাবানল! মানসিক তৃপ্তি সততার পথ থেকে আসে। হালাল ও হারামের পার্থক্য ভুলে গেলে খোদাও তার কুদরতি চাদরের কল্যাণ থেকে বিমুখ করবে। তিনি ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না!

রাজু আহমেদ। কলাম লেখক।
[email protected]

[wps_visitor_counter]