মন্তব্য যেন গন্তব্য হারা না করে

প্রকাশিত : জুন ২৪, ২০২৪ , ১১:১৬ অপরাহ্ণ

প্রতিকি চিত্র।

প্রেম এবং সংসার দু’টোকেই ছেড়ে দেওয়া যায়। ভুল মানুষের কবলে পড়লে প্রেম যত সহজে ছাড়া যায় সংসার তত সহজে ছাড়ে না। কত শত ভুল মানুষকে কাঁধে নিয়ে জীবনের ও-মাথায় পোঁছাতে হয়েছে তা বেহিসাব। শুধু বাবা-মায়ের অসম্মানের কথা ভেবে, সন্তানদের ভবিষ্যতের চিন্তা করে কিংবা সমাজের কটূক্তি শোনার ভয়ে কত সম্পর্ক ভুল মানুষের সাথে গড়িয়ে চলে তার ইয়ত্তা নাই। বিশ্রাম ভাঙতে ভাঙতেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয়। যে মানুষটি ভুল মানুষ সে মানুষটি হয়তো বোঝেও না তাকে অপছন্দের কোন স্তরে রাখা হয়েছে। কেবল দেহ আর খাদ্য পেলেই কোন মানুষ প্রিয় মানুষ হয়ে ওঠে না। বাধ্য হয়েও অরুচিকর অনেককিছু গিলতে হয়, অপছন্দের তবুও মানিয়ে নিতে হয় এবং দুঃখগুলো জমা রেখে হাসিমুখে দাঁড়াতে হয়।

যে মানুষ মন বোঝে না, মনের চাওয়া বোঝে না সে মানুষ প্রিয়জন হয় না। প্রয়োজনের আর পাঁচটা মানুষের তালিকায় সেও খুব সাধারণ হয়ে থাকে। যার সাথে রাত-দিন কাটে সে যদি স্বার্থপর হয় তবে সে জীবন কতখানি বিভীষিকার তা ভুক্তভোগী জানে। যে সঙ্গী দরদ বোঝে না, সম্মান দেয় না এবং অগ্রাধিকারে রাখে না সে মানুষের সাথেও দাম্পত্যের চুক্তিতে জীবন কাটাতে হতে পারে কিন্তু মনের খোঁজ মন এক রোজও পায় না। খারাপ দিনগুলো নিয়ে যে খোঁচা মারে, দুঃখের সময়ে যে পাশে না থাকে এবং চাওয়ার সময়ে যারে পাওয়া যায় না সে থাকার চেয়ে না থাকাতেই মঙ্গল।

সম্পর্কে-সংসারে থেকেও মানুষ কেন একা হয়? অবহেলায়। যখন ভরসা না পায়, মনের কথা জমে জমে ব্যথার পাহাড় বাড়ায় আর সন্দেহ-সংশয়ে সম্পর্ক নিমজ্জিত হয় তখন অনুভূতি ভোঁতা হতে থাকে। একসময় মন একাকীত্বে অভ্যস্ত হয়ে যায়। আনন্দ-শখ গুটিয়ে নেয় এবং হতাশার নীল জলে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। তখন জীবনের মত দুঃসহ, সম্পর্কের মত বোঝা এবং অপাত্রে সুখ আকাঙ্ক্ষার মত বিভ্রম কর কিছুতেই ঘটে না। মানুষ যখন শেষ আশ্রয় থেকেও আশাহত হয় তখন দু’টো পথ খোলা থাকে। হয় স্বেচ্ছামৃত্যু নয়তো জীবনের কাছে সব আশা-আকাঙ্ক্ষার নির্মোহ সমর্পণ। যারা দুঃসময়কে পিঠ দেখিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে সমাজ তাদেরকে সাহসী বলে। তবে এই সমাজ ব্যতিক্রমদের সহজে মানতে নারাজ।

একজন সঠিক মানুষের চেয়ে বড় প্রয়োজন একজীবনে আর দ্বিতীয় কিছুতে নাই। প্রত্যূষে ভুল মানুষের দেখা পাওয়ার চেয়ে গোধূলিতে সঠিক মানুষ এলে সেই অপেক্ষায় থাকা উচিত। ভুল মানুষের প্রলোভনে জীবনকে ক্ষত-বিক্ষত হতে হয় এবং অভিযোগ-অভিমান বাড়তে থাকে। মনের আকাশে কালো মেঘ জমতে জমতে নিজের ওপর থেকে সব আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যায়। অবিশ্বাসের যন্ত্রণায় একবার ভুগলে মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস ওঠে যায়। সুতরাং আশার ছলনে ভোলা যাবে না। একবারের জন্য যে জীবনটা উপহার হিসেবে পাওয়া গেছে সেখানে দুঃখ-কষ্টের কমকিছু ঠাঁই দিতে হবে। আত্মতৃপ্তির সব রসদ নিজের মধ্যে জমা রাখতে পারলে তবেই জীবন আলোকের অংশ হবে।

আবেগ কিংবা ভাবাবেগ অস্বীকারের সাধ্য নাই তবে প্রলোভনের প্রগলভ ভাষা বুঝতে হবে, ভোগের ইশারা থেকে বাঁচতে হবে এবং প্রয়োজন ও প্রিয়জনের মধ্যে পার্থক্য করার বোধটুকু পুষতে হবে। যে তরী গন্তব্যের সে তরীতে পা দেওয়ার আগে বৈঠা এবং মাঝির বিশ্বস্ততা পরখ করতে হবে। যে বিপদ দেখলে ছাড়বে না, মাঝ নদীতে ডোবাবে না- এমন বিশ্বাস যার সাথে জন্মে তার হাত শক্ত করে ধরতে হবে। ঢেউ-তুফান মোকাবেলা করেই তবে কূলে ভিড়তে হয়। যে সুখের দিনে থাকে আর দুঃখের দিনে ছাড়ে তারে পাশ কাটিয়ে চলার ছল শিখতে হবে। অসুস্থ সমাজের কোন মন্তব্য যেন গন্তব্য চেনাতে ভুল না করে। একটু সুখের সাধনায় জীবন জ্বলে উঠুক। হাত হাতের স্পর্শের চেয়ে মন মনের দেখা পাওয়াটা জরুরি। জীবনকে ভেঙে-চুরে গড়ে তবেই সুখের ইমারত তুলতে হবে।

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com

[wps_visitor_counter]