তখন সদ্য প্রাইমারি থেকে ফারেগ হয়ে হাইস্কুলে দাখিল হয়েছি। বাবা যে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক ছিলেন সেই স্কুলের সভাপতি ছিলেন আমাদের ছোটোদের প্রিয় সোবহান ভাই। যেই সেই সভাপতি না। তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনে নির্বাচিত সভাপতি। যদি ভুল না করে থাকি তবে সোবাহান ভাই সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করতে ভোট পেয়েছিলেন ৬১টি! নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কত ভোট পেয়েছিল তা আজ আর স্মরণে নাই। প্রায় দেড় যুগ আগের কথা। সন, তারিখ আর সংখ্যা মনে রাখার মতো পোক্ত মাথা আমার কোনোকালেই ছিল না।
একবার সোবাহান ভাই স্বাক্ষরের ঘরে সোবাহানের জায়গায় ‘হোগাহান’ লিখেছিলেন শুনে সেই শৈশবে এসব নিয়ে আমরা যারা দুষ্ট ছিলাম তারা কম হাস্যরস করিনি। মানুষের ভুল তো হতেই পারে। আমি একবার আরবি পরীক্ষার জায়গায় ‘অরবী’ লিখে ৬০ পেয়েছিলাম বলে আজও ভাবীরা এটা নিয়ে কৌতুক করে!
সোবাহান ভাইয়ের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাব-ক্লাস্টার ট্রেনিং পড়েছিল সেই স্কুলেই! তৎকালে উপজেলা থেকে TO, ATO আসতেন। ইউনিয়নের হেড মাস্টারগণ অংশগ্রহণ করতেন। ট্রেনিংয়ে কী হতো তা জানি না তবে দুপুর ওয়াক্তে ব্যাপক খানাপিনা হতো! সেই সভায় হোস্ট স্কুলের সভাপতির পরিচয় পেয়ে গেস্ট ATO বললেন, যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে সোবহান সাহেব সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, তাতে সভাপতি সাহেব মেম্বরি নির্বাচন করলেও নির্ঘাত মেম্বর হয়ে যাবেন। তৎকালীন এটিও মহোদয়ের বোধকরি অন্য উদ্দেশ্য ছিল! সোবাহান ভাই পেশায় জেলে ছিলেন। ট্রেনিং শেষে ফেরার পথে এটিও মহোদয় যদি নদীর কিছু তাজা মাছ নিয়ে যেতে পারেন! কথা দিয়েই যদি কাজ হয় তবে টাকা দেয় কে!
একে তো নাচুনি বুড়ি, তার ওপরে ঢোলের বাড়ি! এবার সভাপতি সাহেবের মাথায় ঢুকেছে মেম্বর হওয়ার চিন্তা। আল্লাহ’রও কী লীলাখেলা! সন্নিকটেই ইউনিয়ন পরিষদ ইলেকশন। সোবাহান ভাই নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেলেন। সারাদিন নির্বাচনের কাজকর্ম শেষে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমি যে টেবিলে পড়তাম তার পাশের খাটে শুয়ে নির্বাচনী হালহকিকত বলতেন এবং ভোটের হিসাব নিকাশ কষতেন।
সাথে সাথে তৎকালীন সুপারির সিজনে আমি যে নিয়মিত সুপারি চুরি করে বিক্রি করতাম সেসব শুনে আমাকে খুব উৎসাহ যোগাতেন। চুরি করে ক্যাশ ক্যাপিটাল কত হলো, দানাদার কয়টা খেয়েছি- এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনেক কথা হতো। বাড়িতে একখানা মোটাতাজা ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা ছিল। সেটাতে তারিখ অনুযায়ী রাশিফলের ঘরে সোবাহান ভাইয়ের আর আমার রাশিফল রোজ মিলিয়ে দেখতাম! যোগ-বিয়োগ মনোযোগ দিয়ে মেলাতাম। বানিয়ে বানিয়ে সভাপতি সোবাহান ভাইয়ের মেম্বর নির্বাচিত হওয়ার আশাব্যঞ্জক খবর দিতাম! সোবাহান ভাইকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য যত কথা বলা লাগতো তা বলতাম তাতে তা পঞ্জিকার পৃষ্ঠায় অন্য রাশিফলে থাকলেও চুরি করে নিতাম!
রোজ সন্ধ্যায় সোবাহান ভাই আমাকে তার নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণার আপডেট দিত। মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে আমার জন্য বাতাসা-মুড়ি নিয়ে আসতো! আমাদের সম্পর্কের কারনে বিড়িটা সে আমাকে দিতে পারতো না! তৎকালীন নির্বাচনে এই তিন আইটেমের বাইরে প্রার্থীর বাড়িতে খেজুরের গুড়ের র চা এবং ভোটের আগে আগে একবেলা লাউ আর ফার্মের মুরগি দিয়ে ভাতের আয়োজনের রেওয়াজ ছিল! তবে সোবাহান ভাই বিড়ি না দিলে হবে কী- অন্য প্রার্থীদের থেকে আলম এবং গোপাল বিড়ি নিয়ে ঠিকাই ধানখেতে যেতাম। টানতাম কি-না সে রহস্য অজানা থাকুক তবে আমার সঙ্গী সাথী তখন খুব একটা কম ছিল না! ভোটারের বয়স হয়নি বলে সিজার কিংবা নেভী সিগারেট কেউ দেয়নি! এখন মনে হয়, এইটা তারা বৈষম্যমূলক আচরণই করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বোধহয় বলাই হয়নি! সোবহান ভাইয়ের নির্বাচনী কার্যক্রমে সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত আমি তার নির্বাচনী এডভাইজার ছিলাম। তখন বয়সে খুদে হলেও সোবাহান ভাইয়ের কাছে আমার আলাদা কদর ছিল। সে যে মেম্বর হয়ে যাচ্ছে সেই আশা বোধহয় পড়াশোনা বাদ দিয়ে আমি একাই টিকিয়ে রেখেছিলাম। এক সন্ধ্যায় চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে সোবাহান ভাই আমাকে তার ভোটের হিসাব দিচ্ছিল। বিভিন্ন পাড়া, বংশ ও ঘর ধরে ধরে ঘন্টা তিনেক বসে তিনি যে হিসাব দাঁড় করালেন তাতে ৪৫০ ভোট নিম্নে, উচ্চে সেটা ৫৫০ তেও ঠেকে যেতে পারে। পাঠকের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি- তখন আমাদেরর গ্রামে মেম্বর হতে ৩৮০-৪০০ ভোট হলে কেল্লাফতে! কেননা পার্থীর সংখ্যা অধিক এবং সবাই খোটা খোট!
অবশেষে এলো নির্বাচনের দিন! সারা দিনের উত্তেজনা শেষে ভোট গণনার পরে দেখা গেলো সোবাহান ভাই ১৮টি ভোট পেয়েছেন। অর্ধ রাতের পরে সোবাহান ভাই হেলতে দুলতে দুলতে তার খুদে ভক্তের খাটে এসে ঠাস করে শুয়ে পড়লেন! তার সাথে প্রতিজ্ঞা করেও যারা ভোট দেয়নি তাদের জাতিগোষ্ঠী উদ্ধার করলেন। শেষমেশ আলতো স্বরে বললেন, ছোটো ভাই, সভাপতি হতেও তো ৬১ টা ভোট পেয়েছিলাম কিন্তু এখানে তো মাত্র ১৮ ভোট! আমার সভাপতিত্ব কী থাকবে? সোবাহান ভাইয়ের ছোটভাইও দুই ভাইয়ের সেই কালোরাত্রে তার সভাপতি থাকা না থাকা বিষয়ক ফয়সালা দিতে পারে নাই।
আসল গল্প শেষ।
সোবাহান ভাই এখনো নিয়মিত মেম্বরি নির্বাচন করেন। একবারও ভোটের সংখ্যা আঠারোত্তীর্ণ করতে পারেননি। হায়াত পেলে রেকর্ড ভাঙতে পারবেন- এই আশা সোবাহান ভাইয়ের চেয়ে আমি বেশি পুষি।
ফুটনোটঃ যারা নির্বাচনে জয়ী হতে জরিপের ওপর ভর করে আশায় বুক বেঁধেছেন, তাদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে না যাক। ভোটারগণ ধর্ম গ্রন্থের ওপর হাত রেখে শপথ করেও ভোট দেয় না। এই ক্ষেত্রে নারী পুরুষ কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যায় না! যারা আমার মতো ভোটার তাদের কাছে যতজনে ভোট চাইবে তাদের প্রত্যেককেই ভোট দিয়ে দেবে। এমনকি প্রত্যেকের জয়ের ব্যাপারে গ্যারান্টি দিয়ে কিছু খরচাপাতি রেখে দেবে! ভোটররা মানুষ না বজ্জাত! আচ্ছা, যারা মিষ্টি মিষ্টি প্রলোভণ দিয়ে ভোট চায় তারা কী?
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
[email protected]
প্রধান বার্তা সম্পাদক ও চেয়ারম্যান: মো. আতিকুর রহমান
ভাইস-চেয়ারম্যান ও ডিরেক্টর: তানভীর আমের হোসেন (নুমান)
প্রধান সম্পাদক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক: মো. রফিকুল ইসলাম
রিপোর্টিং ও প্রধান কার্যালয়: নাহার ম্যানশন (সি-৯), ১৫০ মতিঝিল সি/এ, ঢাকা – ১০০০। বাংলাদেশ।
ফোন: +88 09611-378696 , ইমেইল: [email protected]
© ২০২৪ ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত