ময়মনসিংহের কলসিন্দুরে ৬ ফুটবল কন্যাদের জয়গান

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২০, ২০২২ , ৬:১২ অপরাহ্ণ

ময়মনসিংহ ব্যুরো, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন: প্রথম বারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলা শেষে ময়মনসিংহের সীমান্ত ঘেঁষা প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ যেখানে বাস যোগেও প্রায় দুই-আড়াই ঘন্টার পথ সেই ধোবাউড়া উপজেলায় যেন হোলি-খেলা শুরু হয়েছে এমনটাই মনে হচ্ছে। শুধু এখানেই শেষ নয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মনে হচ্ছে যেন ফেইসবুকটা কিনেই ফেলছে ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুরের মেয়েরা। আর তা হবেই না কেন, হওয়াটাই স্বাভাবিক কেননা ফাইনাল খেলায় ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর গ্রামের ৬ জন খেলোয়াড় রয়েছে। সানজিদা, মারিয়া মান্দা, শিউলি আজিম, মারজিয়া আক্তার, শামসুন্নাহার সিনিয়র, শামসুন্নাহার জুনিয়র। এছাড়াও এর আগের খেলায় সাজেদা, তহুরাও খেলেছে।
আজ থেকে প্রায় ১১ বছর আগে ২০১১ সালে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ফুটবল টুর্নামেন্ট দিয়ে অপ্রতিরোধ্য এই ফুটবল কন্যাদের শুরু। ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকার গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকে উঠে আসা এই একদল কিশোরী ফুটবলারের পায়ের যাদুতে ধুঁকতে ফুটবল, বিশেষ করে নারী ফুটবল ফিরে পায় চাঁদের আলো। প্রথমে যদিও এলাকার কিছু কিছু মানুষ তাদেরকে ভিন্ন চোখে দেখতো, এখন আর সে অবস্থা নেই। ভিন্ন চোখে দেখার কিছু যৌক্তিকতাও ছিলো তাদের কাছে, কেননা যে মেয়েরা ঘরের কাজ-কাম দেয়ার কথা তারাই ছেলেদের খেলা ফুটবল খেলছে। এই চিন্তা করে অনেক অভিভাবকতো নিজের মেয়েকে খেলতে নিষেধও করে দিয়েছেন। কিন্তু হাঁটি হাঁটি পাপা করে সফলতা আসছে তা দেখে সকলের মনেই পরিবর্তন আসতে শুরু করে। সকলেই তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে হলে তারি ধারাবাহিকতায় আজকের জয় শুধু কলসিন্দুর নয়, উপজেলার প্রতিটি অঞ্চলে, সারা বাংলাদেশে, সাফ অঞ্চলে। নারী ফুটবলারদের সকলের মধ্যে অন্যতম আলোচিত নাম সানজিদা আক্তার। তার সাথে আরও ৬জনের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রাম, সেই-সঙ্গে গোটা বাংলাদেশও। এজন্য কলসিন্দুর গ্রামে বইছে আনন্দের বন্যা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে নারী ফুটবলে প্রতিনিধিত্ব করতে থাকা ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর থেকে উঠে আসা একদল কিশোরী ফুটবলার। লাল সবুজের পতাকাকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরে রাখা কলসিন্দুর গ্রামের নারী ফুটবল দলের কোনও খেলা থাকলে আগ্রহ নিয়ে ওই গ্রামের ফুটবল-ভক্ত ও সমর্থকরা টিভির সামনে বসে থাকেন। ফাইনাল খেলা সম্পর্কে কলসিন্দুর গ্রামের আব্দুল কদ্দুস নামের একজন বলেন, ‘আমরা অনেক খুশি, আমরার মাইয়ারা বাংলাদেশেরে জিতাইছে। আমি ফুরা খেলা দেখছি, আমরার শামসুন্নাহার জুনিয়র মাঠে নাইম্মা পাঁচ মিনিটের মধ্যেই গোল দে এটি আমার অন্তররডা জুড়াইয়া দিসে।’ সাফ জয়ে উচ্ছ্বসিত ফুটবল তারকা সানজিদা আক্তারের বাবা লিয়াকত আলী এই জয়ের প্রতিক্রিয়া জানতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আমার আনন্দের শেষ নেই আজ। বাবা হিসেবে আমি গর্বিত। দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে মেয়েগুলো। এই আনন্দ প্রকাশের ভাষা জানা নেই।’ একই গ্রামের ফুটবল তারকা শামসুন্নাহার জুনিয়রের বাবা বাবা নেকবর আলী বলেন, ‘সকাল থেকেই আমরা পরিবারের সদস্যসহ কলসিন্দুরের ফুটবল ভক্তরা শামসুন্নাহার জুনিয়রসহ সব খেলোয়াড়ের জন্য দোয়া করেছি। যোগ্যতার প্রমাণ রেখে বাংলাদেশের মেয়েরা সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এই জয়ে এলাকার সকলেই আনন্দিত।’ একই গ্রামের মারিয়া মান্ডার মা এনোতা মান্ডা বলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন হয়ে মেয়েগুলো বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। ভবিষ্যতে মারিয়াসহ ফুটবল দলের এসব খেলোয়াড় আরও বড়জয় বাংলাদেশের জন্য এনে দেবে-এটাই প্রত্যাশা।’ এসব ফুটবল তারকার যার হাত ধরে উঠে এসেছেন তাদের স্থানীয় কোচ জুয়েল মিয়া বলেন, ‘কলসিন্দুরের অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে ক্ষুদে ফুটবলারদের নিয়মিত অনুশীলন চলছে। আজকের এই জয় নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের আরও উৎসাহ জোগাবে।’ জয়ে উচ্ছসিত কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও কলসিন্দুর নারী ফুটবল টিমের টিম ম্যানেজার মালা রাণী সরকার বলেন, আজকে জয়ে আমরা অনেক অনেক আনন্দিত, এই জয় আমাদের মেয়ে এবং ছেলেদের জন্য আগামী দিন বিশ্ব জয়ের জন্য অনুপ্রেরণা যোগাবে। মালা রানী সরকার আরও বলেন,‘কত বাধা পেরিয়ে আজ তারা চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জয় করেছেন। এক কথায় পাহাড় সমান বাধা পেরিয়ে ‘সানজিদা আক্তার, মারিয়া মান্দা, শিউলি আজিম, তহুরা খাতুন, শামসুন্নহার সিনিয়র, শামসুন্নাহার জুনিয়র, সাজেদা খাতুন ও মার্জিয়া আক্তার এই অজপাড়া গাঁ কলসিন্দর থেকে হাটি হাটি পায়ে চলতে চলতে শেষে সাফ জয় করেছেন। এই ফুটবল কন্যাদের তৈরি করতে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ২০১১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রথম বারের মতো বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে তারা আলোচনায় আসার পর আরও তিন বার চ্যাম্পিয়নের ধারা অব্যাহত রাখে।’ তিনি আরও বলেন,‘এই অজপাড়া গাঁ কলসিন্দুরের এই মেয়েদের ফুটবল খেলাকে অনেকে ভালো চোখে দেখেনি। এমনকি পরিবার থেকেও তেমন একটা সহায়তা পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে মেয়েরা ভর্তি হওয়ার পর থেকে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বাধা আসে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের মধ্যে শারীরিক নানা পরিবর্তন দেখা দেয়ার পর থেকেই তাদের ফুটবল খেলা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা এবং সেইসাথে স্থানীয় লোকজন ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করে।’ তিনি বলেন, ফুটবল খেলতে গিয়ে নানা ধরনের কটূক্তিও শুনতে হয়েছে কলসিন্দুরের মেয়েদের। স্থানীয়রা মেয়েদের ফুটবল খেলায় উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে বাধা দিয়ে বলতো, ফুটবল খেললে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যাবে না। এ ছাড়াও নানা ধরনের কটূক্তিও করতো। এ সময় স্থানীয় শিক্ষক এবং সমাজ সচেতন মানুষদের সহায়তায় খেলোয়াড়দের পরিবার ও স্থানীয়দের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। মালা রানী আরও বলেন, ‘সাফ চ্যাম্পিয়নের প্রথম পাঁচ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে নেয়া শামসুন্নাহার জুনিয়র ছোটবেলায় মাকে হারায়। গরিব-অসহায় পরিবারে তাকে যতœ করার কেউ ছিল না। কিন্তু ফুটবল খেলার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখে আমি এক বছর তার খাওয়া-দাওয়ার দায়িত্ব নেই। এভাবে নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আসার পথে প্রায় প্রতিটি মেয়ে জাতীয় দলে জায়গা করে নেয়ার পর হঠাৎ করে ফুটবল কন্যা সাবিনার মৃত্যু হলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে কলসিন্দুরের মেয়েরা। সবাই সিদ্ধান্ত নেয়,তারা আর ফুটবল খেলবে না। এরপর তাদের বোঝানো হয় এবং দেশের কথা মাথায় রেখে আবারো ফুটবল খেলায় মনোনিবেশে আগ্রহী করে তোলা হয়। এভাবেই আজকের ফুটবল কন্যারা তৈরি হয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ফুটবলারের মুকুট ছিনিয়ে এনেছে।’ তিনি আরও বলেন,‘এক কথায় জাতীয় নারী ফুটবল দলে কলসিন্দুরের বেশিরভাগ মেয়েরা খেলছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। আশা করি, আগামী দিনে দেশের হয়ে আরও ভালো খেলবে তারা, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’ পাশাপাশি তিনি বলেন আমরা আগামীর জন্য খেলোয়াড় তৈয়ার করার ক্ষেত্রে ছেলে এবং মেয়ে দু’টি ফর্মেটেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। কিছুদিন আগে আমাদের কলসিন্দুর ছোট টিমের মেয়ে এবং ছেলেরা জাতীয় গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা (স্কুল এবং মাদ্রাসা) ২০২২ দু’টি ফর্মেটেই জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করেছে।’