ঝিনাইদহ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে জেলা প্রশাসনে তদন্ত শুরু

প্রকাশিত : জুলাই ২৪, ২০২২ , ৮:৪২ অপরাহ্ণ

হেলালী ফেরদৌসি, ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন: ঝিনাইদহ জেলা সদরের সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। ঘুস-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে ঝিনাইদহের সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। সরকারি এই কার্যালয়টি ঘুষ, অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে এমন পরিচিতিই ছড়িয়েছে জেলার সবখানে! ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকার ডিজিটাল প্রযুক্তি চালুর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক সমিতি, সাব-রেজিস্টার,কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থান এর বিপরীতে। ফলে প্রকাশ্যে চলছে লাখ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন। দলিল সম্পাদনের নামে দিনের পর দিন অসাধু দলিল লেখকদের যোগসাজশে মোটা অঙ্কের ঘুসের মাধ্যমে চলছে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ। এখানে ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল রেজিস্ট্রি করা যায় না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এটা এখন নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। সাব-রেজিস্টারের এজলাসে দেখা গেছে, সাব-রেজিস্টার আমেনা বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন নকল নবিশ এসোসিয়েশনের সভাপতি জাকির হোসেন। তিনিই দলিলগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। দলিল রেজিস্ট্রি করতে সরকার নির্ধারিত আয়কর ও ভ্যাটের টাকার ব্যাংক ড্রাফট দেয়ার পরও অতিরিক্ত ঘুষের টাকা দিতে হয়। দলিল লেখকের ফ্রি, স্ট্যাম্প খরচ, এন ফিসের টাকা বাদ দিয়ে বাকি টাকা সিন্ডিকেটের ঘুষ ।দলিলের ফি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করলেও সেরেস্তা (অতিরিক্ত ফি) ছাড়া সাব-রেজিস্টার কোনো দলিল রেজিস্ট্রি করেন না।ঘুষের এ টাকা ছাড়া জমির দলিল সম্পাদিত হয় না। সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে জমির বিভিন্ন ক্রুটি দেখিয়ে, দলিল রেজিস্ট্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ টাকা সিন্ডিকেটের সমন্বয়ে ভাগ ভাটোয়ারা করা হচ্ছে। এছাড়াও দলিলের নকল তুলতে গেলে সরকারি ফির দ্বিগুণ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়।
ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়ম-দুর্নীতির পেছনে রয়েছেন সাব-রেজিস্টার আমেনা বেগম। তার সঙ্গে রয়েছেন নকল নবিশ এসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ জাকির হোসেন, স্থানীয় দলিল লেখকদের একটি চক্র,দলিল লেখক সমিতির সভাপতি,সাধারন সম্পাদকসহ অফিসের অসাধু কর্মকর্তারা । তাদের যোগসাজশ প্রতিদিনই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং দলিল লেখক সমিতির দ্বারা পরিচালিত একটি চক্র রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে।অথচ ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস দুর্নীতিমুক্ত এমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বিভিন্ন দলিল লেখক ও সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত ৩৫০০/=,৪০০০/= টাকা দলিল লেখক সমিতি এবং সাব রেজিস্টারের নামে সংগ্রহ করা হয়। সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত টাকা না দিলে তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। সেবা-প্রার্থীরা সব সময়ই অসহায়। দলিল দাতা ও গ্রহীতাদের হয়রানি এবং অ-নৈতিকভাবে অর্থ আদায় করে থাকেন। দলিল লেখক সমিতির নামে সিন্ডিকেট গঠন করে এই টাকা আদায় করা হয় জমি ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সদর সাব-রেজিস্টার আমেনা বেগম, দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক আক্তারুজ্জামান লাইসেন্স নং ৮২,দলিল লেখক আসাদুল আলম লাইসেন্স নং ১৩২ ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নকল নবিশ এসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ জাকির হোসেন এর বিরুদ্ধে ঘোষণার দলিলসহ বিভিন্ন প্রকার দলিল রেজিস্ট্রি সম্পাদনের নামে অতিরিক্ত ঘুষ দাবি সংক্রান্ত অভিযোগ দাখিল করেছেনে ১৯ এপ্রিল ২০২২ তারিখে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক বরাবর।হেবা দলিলে মাত্র এক হাজার টাকা খরচ হলেও সমিতি নেয় ১০/১৫ হাজার টাকা। এমনিভাবে প্রতি মাসে কৃষকের রক্ত চুষে লাল হচ্ছে এই সিন্ডিকেট।বাড়ি, গাড়ি ও মাঠে জমি কিনে শহরবাসী এবং গ্রামবাসীকে রীতিমত তাক লাগিয়ে দিয়েছে এই সিন্ডিকেট। শহরের মানুষ তাদের এই আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার রহস্য পায় না। ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাই জানে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুস ছাড়া দলিল রেজিস্ট্রি হয় না। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় বহুবার সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কমিটির সম্মানিত সদস্য-গন বক্তব্য রেখেছেন। তার পরও সবাই সব জেনেও নীরব! সবাই সব জেনেও কী করবে, তারা পারলে এর মধ্যে থেকে অনেকে কমিশন পাচ্ছে! শুধু সাধারণ জনগণের ক্ষতির খাতটা বাড়ছে। এতে তো কারো কোনো মাথা-ব্যথা নেই।ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় দলিল দাতা ও গ্রহীতারা এবং জনসাধারণ উৎকোচ প্রদানে বাধ্য হচ্ছে।
ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়ম নতুন কোনো ঘটনা নয়। সদর উপজেলার সাধারণ মানুষ বরাবরই দলিল লেখক সমিতি এবং সাব রেজিস্টারের দৌরাত্ম্যে নাজেহাল। প্রতিটি দলিল সম্পাদনে কাগজপত্র সঠিক হলেও যেমন ঘুষ দিতে হয়, তেমনি কাগজপত্রে কোনো ক্রুটি থাকলেও দিতে হয় ঘুষ। এমন জঘন্য ও বিশ্রী দশার কবলে নিষ্পেষিত হচ্ছে ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষ। কৃষকরা জমি কেনা-বেচা করতে এলে তাদের সরকারের ফি আর দলিল লেখকদের পারিশ্রমিক ছাড়া আর কোনো খরচ নেই। কিন্তু দেখা যায় দলিল প্রতি দলিল লেখক সমিতি জোরপূর্বক পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা অতিরিক্ত গ্রহণ করেন। এটা অন্যায় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই রক্তচোষা সিন্ডিকেট ভেঙে সাধারণ কৃষকদের মুক্ত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি উদাত্ত আহ্বান ঝিনাইদহ বাসির।ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসন,পুলিশ বিভাগ,র‌্যাবসহ সরকারিভাবে এমন অবস্থার প্রশমনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। ঝিনাইদহ সদর সাব-রেজিস্টার আমেনা বেগমকে এ বিষয়ে একধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।