নাচোলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাসায়নিক সারের দাম বৃদ্ধি

প্রকাশিত : জুন ১২, ২০২২ , ৩:০৯ অপরাহ্ণ

মোঃ আশরাফুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি, ব্রডকাস্টিং নিউজ কর্পোরেশন:চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাসায়নিক সারের দাম বৃদ্ধি করে ভর্তুকির সার বিক্রিতে নৈরাজ্য চলছে । উপজেলা কৃষি অফিসের নজরদারি না থাকার কারনে এবং কতিপয় সিন্ডিকেটের কারনে সরকারের ভর্তুকির সার বিক্রিতে সরকারের মহৎ উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে।তবে ডিলারদের কারসাজির কারনে সারের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। অনুমোদিত ডিলারকে বরাদ্দ সার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তোলন করতে হয়। সার উত্তোলনের পর উপজেলা মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা সদস্য সচিব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পৃথক অথবা যৌথভাবে ডিলারের দোকান পরিদর্শন করে সার উত্তোলন ও সংরক্ষণের কাগজপত্র নিশ্চিত হবেন। গুদাম থেকে সার উত্তোলনের পর পরিবহনের বরাদ্দ-পত্র,চালান ও বাফারের ছাড়পত্র,কোথায় সার যাবে,সেই ঠিকানা চালানপত্রে থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু নাচোল উপজেলায় সার বিক্রিতে এসব নিয়মের কোনো বালাই নেই। কোনো ডিলার সার উত্তোলন করতে না পারলে তার বরাদ্দ মনিটরিং কমিটির কাছে সমর্পণ করতে হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ,উপজেলা সার মনিটরিং কমিটি বিষয়টি জানার পরও অজ্ঞাত কারণে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যার ফলে সার ডিলাররা ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বস্তা প্রতি ৫শ থেকে ৮০০টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছে।চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের এক আইনজীবী তাঁর আম বাগানের জন্য দোকানে সার কিনতে গেলে পরিচয় দেওয়ার পর ও তাঁর ভাগ্যে জোটেনি রাসায়নিক সার। একজন আইনজীবী হয়ে যদি সঠিক দাম দিয়ে সার না পায় তাহলে সাধারণ কৃষকদের তো সারের জন্য আরো দুরবস্থা। অভিযোগে জানা গেছে,ডিএপি ও ইউরিয়া(এক বস্তা) ৫০ কেজির সারের সরকারি মূল্য ৮০০ টাকা,টিএসপি ১বস্তা সারের মূল্য ১১০০টাকা সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হলে ও সার ডিলাররা ইউরিয়া সার ১০০০ টাকা,টিএসপি ১৬শ থেকে ২ হাজার টাকা করে নিচ্ছে। দামের ব্যাপক গড়মিল ট্রিপল সুপার ফসফেট(টিএসপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সারে। প্রকাশ্যে বেশি দামে সার বিক্রি করলেও তাদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা তো দুরের কথা বরং আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সার ডিলাররা। কৃষক দাম নিয়ে দর কষাকষি করলে সরকারি সার নেই বলে জানিয়ে দেন ডিলাররা। আর যা আছে তা বিভিন্ন জায়গা থেকে কিনে আনা হয়েছে বলে জানিয়ে দেন। তাই বেশি দাম দিলে পাওয়া যাবে। অনুসন্ধানে জানা-গেছে চলতি(জুন) মাসে নাচোল উপজেলায় ২২১মেট্রিক টন ইউরিয়া,২২মেট্রিক টন টিএসপি,১১০ মে:টন পটাশ এবং ১৮০ মে:টন ডিএপি সার বরাদ্ধ হয়। এই মাসে সারের তেমন কোন চাহিদা কৃষকের না থাকলেও সার ব্যবসায়ীরা আমন মৌসুমের জন্য অগ্রিম স্টক করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চওড়া দামে সার বিক্রি করছে। গত সোমবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ কোটের আইন জীবী মাহবুব আলম জুয়েল তাঁর আম বাগানে সার দেওয়ার জন্য নাচোল পৌর এলাকার রেলস্টেশনে এক খুচরা সার ব্যবসায়ীর দোকানে ইউরিয়া,টিএসপি,পটাশ সার ক্রয়ের জন্য গেলে প্রথমে ঐ ব্যবসায়ী সার নাই বলে জানায়,কিছুক্ষণ পরে আবার সার ব্যবসায়ী জানায় সার আছে তবে বেশি দাম দিতে হবে। ইউরিয়া সার বস্তা প্রতি ২০০টাকা বেশি, টিএসপি ৮০০টাকা বেশি দাম চাইলে আইনজীবী মাহবুব আলম জুয়েল সে সারের দোকান ত্যাগ করে বাস-স্ট্যান্ডে একটি সারের দোকানে গেলে সেখানেও একই সারের বেশি দাম চায় সার ব্যবসায়ী। বেকায়দা অবস্থায় ঐ আইন জীবী নেজামপুর ইউপির হাটবাকইল মবিল ট্রেডার্স (বিসিআইসি) সার ডিলারের দোকানে সার ক্রয় করতে গেলে সেখানে ও পূর্বের সার দোকান ব্যবসায়ীর মত আচরণ করেন।পরে ভুক্তভোগী আইনজীবী জুয়েল উচ্চ দামে সার ক্রয় না করেই হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যান। নাচোল সদর ইউপির খেসবা গ্রামের এক কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান,গত বৃহস্পতিবার সকালে নাচোল বাজারের একটি দোকানে টিএসপি সার কিনতে গেলে প্রথমে সার ব্যবসায়ী জানান সার নেই,কৃষক শহিদুল ইসলাম ঐ সার ব্যবসায়ী কে অনেক অনুরোধ করার পর ১৭শ টাকা দিয়ে এক বস্তা টিএসপি সার ক্রয় করেন। যা সরকারি মূল্যের চেয়ে প্রায় ৬০০টাকা বেশি। অনুসন্ধানে আরো জানাগেছে,নাচোল উপজেলায় ১০জন বিসিআইসি এবং ১০জন বিএডিসি সার ডিলার রয়েছেন। যেসব বিসিআইসি সার ডিলার রয়েছেন তাদের লাইসেন্সে নির্ধারিত স্থানে দোকান করার নিয়ম থাকলেও কৃষি কর্মকর্তার যোগসাজশের মাধ্যমে লাইসেন্স কৃত স্থানে সার দোকান না করিয়ে সদরে দোকান স্থানান্তরিত করিয়েছেন।যার ফলে লোকালয়ের সাধারণ কৃষকরা পরিবহন খরচ বেশি দিয়ে সদরে সার ক্রয় করতে আসতে হচ্ছে। নাচোল উপজেলায় বেশ কিছু সার ডিলার সার মজুদ রাখার কারনে গোয়েন্দা সংস্থার জালে ধরা পড়লেও সেসব সার ডিলারদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। যার ফলে সেসব সার ডিলাররা আরো সার বিক্রিতে নৈরাজ্য তৈরি করছে। সরেজমিনে গিয়ে ও কৃষকদের অভিযোগে জানা যায়, সারের দাম বেশি নেওয়া হলেও ডিলাররা কোনো রসিদ দিচ্ছেন না। কেউ কেউ রসিদ দিলেও তাতে সরকার নির্ধারিত দাম দেখাচ্ছেন।আবার বেশি দাম নিয়ে প্রতিবাদ করলে সার বিক্রি করবেন না বলে ডিলাররা জানিয়ে দিচ্ছেন।ডিলারদের কাছে এভাবে জিম্মি হয়ে তাঁরা অসহায় হয়ে পড়েছে। তবে ডিলারদের দাবি,জুন মাসে নাচোল উপজেলায় চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ার কারণে বাজারে সারের কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে। তবে সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করছেন তাঁরা। এবিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী মাহবুব আলম জুয়েল অভিযোগ করে বলেন,গত সোমবার নাচোলে আমার আম বাগানে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করবো বলে দোকানে সার ক্রয় করতে গেলে নাচোল রেলস্টেশনের এক সার ব্যবসায়ী আমাকে প্রথমে বলে সার নেই,তবে বেশি দামে নিলে যা নিবেন তাই দেওয়া যাবে। পরে সে দোকানে আমি সার ক্রয় না করে নাচোল বাস-স্ট্যান্ডে একটি সারের দোকানে যাই সেখানে ও বেশি দাম চায়।পরে ঐদিন নেজাপুর হাটবাকইলে মবিল ট্রেডার্স এ সার ক্রয় করতে গেলে সার ডিলার আমার সাথে খারাপ আচরণ করে এবং সরকারি দামের চাইতে বেশি দামে সার নিতে বলে। আমারর কাছে সারের দাম বেশি চাওয়ায় আমি আর সার ক্রয় করিনি।এবিষয়ে নাচোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহম্মেদ এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,বর্তমানে সারা দেশে টিএসপি ও পটাশের সংকট রয়েছে। এখন কৃষকদের সারের তেমন চাহিদা না থাকলেও আম বাগান ব্যবসায়ীরা প্রচুর পরিমাণে বাগানে সার দিচ্ছে। সারের কিছুটা সংকট থাকার কারনে ডিলাররা সারের দাম অতিরিক্ত নিতে সুযোগ নিচ্ছে,তবে কেউ অভিযোগ করলে ঐ ডিলারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।